আকিদাহ, ঈমান ও পতনোম্মুখ মুসলিম বিশ্ব

আকিদাহ, ঈমান ও পতনোম্মুখ মুসলিম বিশ্ব

আকিদাহ শব্দটি আমাদের দেশে বহুল প্রচার লাভ করেছে মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে আসা কতিপয় শায়খ দ্বারা। আমরা ঈমান আমল ঠিক করার কথা শুনতাম এক সময়, আর এখন শুনি আকিদাহ সহীহ করার কথা- যার অর্থগত দিক দিয়ে একই রূপ মনে হলেও ভিন্ন উদ্দেশ্যে এর ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। যেহেতু এতে বহির্দেশের অর্থ প্রণোদনা জড়িত, কাজেই এর গতি উলম্ফ।

আকিদাহ শব্দটি কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। কাজেই আকিদাহ সহীহ করার কথাও কুরআন-হাদীসে নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আদম আ. থেকে শুরু করে মুহাম্মদ সা. পর্যন্ত কোন নবী-রাসূলকে এই মিশন দিয়ে দুনিয়ায় পাঠাননি। নবী-রাসূলগণের মিশন ছিল ঈমানের আহবান, কুফর ও শিরক সম্পর্কে সতর্কীকরণ। এরই ধারাবাহিকতায় রাসূল মুহাম্মদ সা. এর যুগ, সাহাবা ও তাবেঈন রা. এর যুগে আকিদাহ বলে কোনো বিষয় আলোচনায় স্থান পায়নি। তাবেঈন রা. এর যুগের শেষ ভাগে এসে ঈমান একক না সমন্বিত বিষয়াবলীর (বসিত্ব না মুরাক্কাব) নাম, তা নিয়ে বিস্তর মতভিন্নতার সূত্রপাত ঘটেছে এবং তাবেঈন রা. এর পরবর্তী যুগে আকিদাহ শব্দ ঈমানের তিনটি অংশের একটি (তাসদিক বিল জিনান) অন্তরে সত্যায়ন-এর ব্যাখ্যায় উল্লেখিত হয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, পরবর্তী যুগগুলোতে আকিদাহ শব্দের ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে এবং অধিকাংশ আলিম এটার উপর চর্চা ও কিতাবাদি লেখায় অনন্য অবদান রেখে গেছেন।

এ কথা সর্বজনবিদিত যে, আলী রা. ও ফাতিমাহ রা. এবং এতদুভয়ের বংশধররাই আহলু বাইত হিসেবে পরিচিত। আলী রা. এর সাথে খিলাফত কেন্দ্রিক মুয়াবিয়া রা. এর দ্বন্দ সংঘাতে তৈরী হওয়া আলী রা. এর সঙ্গী সাহায্যকারী শিয়া সম্প্রদায়, যাদের ব্যাপক উত্থান ঘটে ইমাম হোসাইনের কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার পর।

শিয়ারা অনেক শাখা প্রশাখায় বিভক্ত এবং প্রধান শাখাগুলোর সংখ্যা বারোটি। এদের মধ্যে গুলাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত যারা, তারা রাসূল মুহাম্মদ সা. কে নবী হিসেবেও মানে না, এদের মধ্যে আলাভী সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য। আবার যায়দিয়্যাহ গ্রুপ অনেকটা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মতই আকিদাহ পোষণ করে। যেমন ইয়ামানের হুছিরা (হুথিরা)। কিছু গ্রুপ রয়েছে যারা আবু বকর, ওমার, উসমান রা. এবং আয়িশা রা.কে গালি দিয়ে থাকে। ইবনু কাছির উল্লেখ করেছেন উমাইয়্যারা আলী রা. কে গালি দিতো এবং তা ওমার ইবনু আব্দিল আযিয এর শাসনকালের পূর্ব পর্যন্ত চলমান ছিল। ওমার ইবনু আব্দিল আযীয রহ. ক্ষমতায় এসেই ফরমান জারির মাধ্যমে তা রহিত করেন। অনেকটা রদ্দে ফে’ল বা প্রতিক্রিয়া স্বরূপ গালি দেয়ার প্রচলন হয়েছিল। তবে ইতিহাস সাক্ষী আমীরে মুয়াবিয়া রা. আলী রা.কে অনেক শ্রদ্ধা করতেন ইসলাম গ্রহণের দিক দিয়ে প্রথম কাতারে ছিলেন বলে। শিয়া বা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের যে কেউ যদি সাহাবা রা. কে গালি দেয় তাহলে ইজমায়ে উম্মাহ অনুযায়ী সে কুফরী করলো।

উমাইয়্যাহ যুগে সক্রেটিস-প্লেটোর তথা গ্রীক দর্শন আরবীতে অনূদিত হয়ে ইসলামী বিশেষজ্ঞ শ্রেণীর মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, যার ধারা আব্বাসীয় যুগে আরো ব্যাপকতা লাভ করে। এ সময়কালে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয় এবং অনর্থক বিষয়াবলীর উপর বিতর্ক তৈরী করে মুসলিম জাতিস্বত্বাকে বিভাজনের পথে ধাবিত করে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট? এই বিতর্কে রাজা বাদশাহরা কুরআন সৃষ্ট মতের পক্ষাবলম্বন করে এর বিরোধী মতের আলিমগণকে জেলে ভরে শাস্তি দেয়। ইমাম আযম আবূ হানিফা রহ. এবং ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহ. কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। অথচ বিতর্কিত বিষয়টিতে মুসলিম জাতিস্বত্বার ক্ষতি বৈ কোনো উপকার হয়নি। গ্রীক দর্শনের প্রভাব স্কুল অব থটস এর জন্ম দেয়, যা আকিদাহর বিষয়াবলীতেও বিতর্কের বিভাজন তৈরী করে। আশায়িরাহ, মাতুরিদিয়্যাহ, জাবারিয়া, কাদারিয়া, জাহমিয়া নানা গোষ্ঠীর চিন্তাধারার স্রোত সমাজকে ভঙ্গুরতার নদীতে ডুবিয়ে দেয়।

হিজরী চতুর্দশ শতকের মুজাদ্দিদ (বিতর্কিত) হিসেবে পরিচিত আব্দুল ওহহাব নজদীর শিরক-বিদআত মুক্ত ইবাদাতের আন্দোলনে আকিদাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে পরিচিতি পায়। তার চিন্তাধারাকে লালনকারী সৌদিআরবের আলে সৌদ রাজবংশের বদান্যতায় বৈশ্বিক পরিমন্ডলে এর ব্যাপক প্রচারণা চলমান। আব্দুল ওহাব নজদীর আকিদায় রাসূল সা. এর প্রতি ও সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষভাব পরিষ্ফুটিত হয়েছে। যারা সে সময় হজ্জ করতে যেতেন, তাদেরকে মক্কা থেকেই দেশে ফেরত পাঠানো হতো, মদীনায় রাসূল সা. এর রওজা মোবারকে সালাম দিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই মর্মে প্রচারণা চালানো হতো, কারণ এটি হজ্জের অংশ নয় বলে।

রাসূল সা. এর বড় বড় মর্যাদাবান সাহাবার কবরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে উম্মতে মুহাম্মদীকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত করা হয়েছে কবর যিয়ারতের আত্মিক প্রশান্তি ও তাঁদের ইতিহাস স্মরণ থেকে। এ কাজে কতিপয় মুসলিমের বাড়াবাড়িও সীমা ছাড়িয়েছিল, ফাতিমা রা. এর কবরের মাটি যিয়ারতকারীরা নিয়ে যেতো, ফলে প্রতি বছর কবরে ট্রাকভর্তি মাটি ফেলতে হতো। ভালো-খারাপের মিশেলেই আব্দুল ওহাব নজদের জীবনের অবসান ঘটেছে এবং তার আকিদাহ সমালোচনামুখর বিস্তারণ অব্যাহত আছে। মুহাক্কিক আলিমগণ নিন্মোক্ত হাদীসের ইংগিত থেকে আব্দুল ওহাব নজদের দিকেই আঙ্গুল তুলেছেন। যদিও নজদের মাটিতেই জন্ম হয়েছিল ভন্ড নবীর দাবিদার মুসায়লামার। এতদুভয়ের দিকেই হাদীসটি ইংগিতবহ বলে অনেকেই মনে করেন।
وعن ابن عمر أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: اللهم بارك لنا في شأمنا اللهم بارك لنا في يمننا، قالوا: وفي نجدنا، قال: اللهم بارك لنا في شأمنا وبارك لنا في يمننا، قالوا: وفي نجدنا، قال: هناك الزلازل والفتن وبها أو قال منها يخرج قرن الشيطان. رواه الترمذي وقال: هذا حديث حسن صحيح غريب من هذا الوجه.

ইবনু ওমার রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন: হে আল্লাহ শ্যামদেশে আমাদেরকে বরকত দান কর এবং ইয়ামানেও আমাদের জন্য বরকত দান কর। সাহাবাদের কেউ কেউ বললেন আমাদের নজদেও। রাসূল সা. পুন:বার বললেন: হে আল্লাহ শ্যামদেশে আমাদেরকে বরকত দান কর এবং ইয়ামানেও আমাদের জন্য বরকত দান কর। পুনর্বার সাহাবাদের কেউ কেউ বললেন আমাদের নজদেও। রাসূল সা. বললেন ওখানে ভূমিকম্প ফেতনা-ফ্যাসাদের সম্ভাবনা রয়েছে, যার দ্বারা অথবা বললেন ওখান থেকে শয়তানের শিং গজিয়ে উঠবে।(ইমাম তিরমিযী তাঁর সুনানুত তিরমিযীতে এ হাদিসটি উল্লেখ করে বলেছেন- হাদীসটি হাসান সহীহ গরীব)।

আব্দুল ওহাব নজদীর চিন্তাধারাপুষ্ট কতিপয় মাদানী শায়খরা আমাদের দেশের মানুষকে নতুনভাবে ইসলাম শিখাচ্ছেন- “আবূ বকর, ওমার, উসমান, আলী রা. এর শেখানো পদ্ধতিতে সালাত (নামাজ) পড়লে সালাত আদায় হবে না।” ওমার রা. বিশ রাকআত তারাবীহ জামাতবদ্ধভাবে আদায়ের সিস্টেম চালু করে বেদআত করেছেন, উসমান রা. শুক্রবার জুমার সালাতের জন্য আযান একটি বাড়িয়ে বেদআত করেছেন। ধিক! এসব আকিদাহর ফেরিওয়ালাদের। এরাই আবার বলছে শিয়ারা সাহাবাদের গালি দেয়, অতএব ওরা কাফির। এসব ফেরকাবাজদের হাত থেকে আল্লাহ দ্বীন ইসলামকে রক্ষা করুন।

দ্বিতীয়ত হাদীসটিতে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়কালের ইংগিত বর্তমান। যেখানে শ্যাম (তথা সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন) ও ইয়ামানের মর্যাদা তুলে ধরেছেন রাসূল সা.। আর এসব দেশ বর্তমানে ইহুদীদের সাথে যুদ্ধরত আছে এবং সিরিয়া ও ইয়ামান শিয়া মতবাদে বিশ্বাসীদের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনান করছে, যাদেরকে কাফির ফতওয়া দিয়ে আমরা আত্বতৃপ্তিতে নিদ্রামগ্ন আছি।

ইমাম মালেক, শাফেঈ, আহমদ ইবনু হাম্বল, আওযায়ী, ইসহাক ইবনু রাহওয়াই রহ. প্রমুখ এবং হাদীসবেত্তাগণ, মদীনাবাসী, আহলুয যাহের, কালাম শাস্ত্রবিদদের একটা গ্রুপ মনে করেন- অন্তরে বিশ্বাস, মুখে তার স্বীকৃতি প্রদান এবং ঈমানের মৌলিক ভিত্তিসমূহের উপর আমল করা বা কার্য সম্পাদন করার নাম ঈমান। (تَصْدِيق بِالْجَنَانِ، وَإِقْرَارٌ بِاللِّسَانِ، وَعَمَلٌ بِالْأَرْكَانِ )

উপরোক্ত ইমামগণসহ লাইস ইবনু সাদ, সুফিয়ান ছাওরী ইমাম আবু জা’ফর আতত্বাবারী রহ. প্রমুখদের নিকট ঈমান হচ্ছে-কথা ও কাজ। মুখে বলা অর্থ অন্তরের বিশ্বাসকে স্বীকৃতি প্রদান এবং বিশুদ্ধ নিয়তসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল বা কাজে পরিণত করা الإيمان قول وعمل ،  قول باللسان وهو الإقرار اعتقاد بالقلب وعمل بالجوارح ، مع الإخلاص بالنية الصادقة
ইমাম আযম আবূ হানিফা রহ. ঈমানের সংজ্ঞায় বলেছেন- অন্তরে বিশ্বাস ও মুখে তার স্বীকৃতি প্রদান- الإيمان هو التصديق والإقرار (ফিকহুল আকবার-পৃ.-৮৫)।

ইমাম আবূ মানছুর মাতুরদী ইমাম আবূ হানিফা রহ. থেকে বর্ণনা করে বলেন: ঈমান হচ্ছে অন্তরের বিশ্বাস, আর স্বীকৃতি হলো বিধানাবলী কার্যকর করার শর্ত। ইমাম আবূ জা’ফর আত-ত্বাহাভী রহ. বলেন: أنه إقرار باللسان ، وعمل بالأركان .ঈমান হচ্ছে মুখে স্বীকৃতি এবং এর মৌল ভিত্তিসমুহের উপর আমল করা। এটাই অধিকাংশ হানাফী আলিমগণের মত। ফিকহ ও হাদীসের বিশারদগণ সর্বসম্মতভাবে একমত যে, ঈমান হলো কথা ও কর্ম এবং নিয়ত ছাড়া কোনো কাজ নেই এবং তাদের মতে আনুগত্যের সাথে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং অবাধ্যতার সাথে হ্রাস পায় এবং তাদের মতে সকল আনুগত্যই ঈমান। ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং তার সাথীগণের মতে আনুগত্যকে ঈমান বলা হয় না।
ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়েও রয়েছে বিস্তর মতভিন্নতা এবং বিস্তর গবেষণা। এ প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় সে আলোচনায় যাচ্ছি না।

অন্তরের বিশ্বাসসমূহের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আকিদাহ, যাকে অস্বীকার করার কোনো অজুহাত নেই, এর উপর রয়েছে ইজমায়ে উম্মাহ। যদিও দৃষ্টিভঙ্গীগতভাবে দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবিত শব্দ আকিদাহ, কেউই বলবে না যে, তা বিদআত। কিন্তু আমরা আকিদাহ কপচাতে কপচাতে ঈমানকে হারিয়ে ফেলেছি। ঈমানের দরকারই বা কী? ঈমান না থাকলেও আকিদাহ সহীহ হলেই একেবারে বেহেশত কনফার্ম। যে চিড়িয়াখানার তুলনা না এ পৃথিবীতে আছে, না আখিরাতে।

ঈমানের বিপরীত শব্দ হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যে যা এসেছে, তা হলো কুফর। জানা বিষয়কে গোপন করা বিশেষভাবে আল্লাহ সকল কিছুর স্রষ্টা জেনেও তা বিশ্বাস না করা। তাঁর প্রেরিত রাসূল ও কিতাবকে বিশ্বাস না করা ইত্যাদি। একজন বিশ্বাসী মু’মিন এবং একজন অবিশ্বাসী কাফির হিসেবে পরিচিত। ঈমানের ষাট বা সত্তর উর্ধ শাখাপ্রশাখা রয়েছে সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা স্বীকৃত। কাজেই ঈমানের পূর্ণতা আনয়ন একজন মু’মিনের আরাধ্য বিষয় হলেও তা কষ্টসাধ্য। যে জন্য একজন মু’মিন পদস্খলনজনিত পাপের প্রায়শচিত্ত করার পর বেহেশতে যাবে এবং কবীরাহ গুণাহ করলেও চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে না- এ বোধ ও বিশ্বাস আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের।

এবার দেখা যাক আল্লাহর দেয়া জীবন বিধান আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতসমূহের আলোকে মুসলিম জাহানের শাসকবর্গ, রাজা বাদশাহদের ঈমান কতটুকু বেঁচে আছে- আল্লাহ তা’আলা ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُواْ بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لاَ يَأْلُونَكُمْ خَبَالاً وَدُّواْ مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاء مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الآيَاتِ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ 
হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের ভিন্ন অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের সর্বনাশ করতে ত্রুটি করবে না। তারা তোমাদের মারাত্মক ক্ষতি কামনা করে। তাদের মুখ থেকে তো শত্রুতা প্রকাশ পেয়ে গেছে। আর তাদের অন্তরসমূহ যা গোপন করে, তা অধিক ভয়াবহ। অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ সুষ্পষ্ট বর্ণনা করেছি। যদি তোমরা উপলব্ধি করতে। (সূরা আল ইমরান-১১৮)।

আল্লাহ তা’আলা আরো স্পষ্টভাবে বললেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ ۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তারা পরষ্পর একে অপরের বন্ধু, আর যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তারা ওদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে পথ দেখান না। (সূরার মায়িদাহ-৫১)।

খোদ ইসরাঈলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে যারা জড়িয়ে আছেন- সৌদিআরবের প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমান, আরব আমিরাতের মুহাম্মদ বিন যায়েদ আল-নাহিয়ান, জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ বিন হোসাইন, মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মুহাম্মদ, বাহরাইনের রাজা হামাদ বিন ঈসা আল-খলিফা, মিশরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ সিসি আল-ফাত্তাহ এদের মধ্যে দু’জনের মা ইহুদী এবং দু’জন রাজা রাসূল সা. এর বংশের হাশেমীয়।। মরক্কো বাদে বাকীরা ঘিরে আছে ফিলিস্তিনের চারপাশ। এদের গভীর বন্ধুত্ব রয়েছে ইসরাঈলের মদদ দাতা আমেরিকার সাথেও। এসব দেশের সাথে ইসরাঈলের চুক্তি রয়েছে এবং সৌদি আরব চুক্তিবদ্ধ হওয়ার দ্বার প্রান্তে পৌছেছিল, কিন্তু হামাসের আক্রমণ সব ভুণ্ডুল করে দেয়। এরা সবাই নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদাহর ধারক ও বাহক দাবী করেন। এদের আকিদাহ সহীহ কিন্তু কুরআনের আয়াতগুলোর দাবী এরা পূরণে অক্ষম অথবা এরা মুনাফিক ও গাদ্দার। আল্লাহ তা’আলা কাফিরদের নামে একটি সূরাহ নাযিল করেছেন সূরাহ কাফিরুন, যার আয়াত সংখ্যা মাত্র ৬টি, আর মুনাফিদের বিষয় সূরাহ মুনাফিকুন নাযিল করেছেন যার আয়াত সংখ্যা ১১টি। এতে বুঝা যায় কাফিরদের চেয়ে মুনাফিকরা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কতটা খতরনাক।

ইসরাঈল নামক বিষ বৃক্ষের জন্মদাতা বৃটেন এবং লালন ও পালনকারী আমেরিকা। আলে সউদ পরিবার ১৯৩২ খ্রি. সৌদিআরব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল বৃটিশ বাহিনীর সহায়তায়, আর বৃটিশরা ফিলিস্তিনে ইহুদীদের বসতি স্থাপনের সুযোগ নিয়েছিল বদলা হিসেবে। একই কারণে ১৯৪৮ খ্রি. জাতিসংঘে ইসরাঈল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ঘোষণার পর থেকে তিনবার আরব-ইরাঈল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং প্রত্যেকবারই রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের ময়দান থেকে কেটে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মিশর ও সিরিয়া, হারিয়েছে বিশাল ভূ-খণ্ড। ১৯৭৪ খ্রি. মিশর-ইসরাঈল ক্যাম্প ডেভিড শান্তি চুক্তির আওতায় সিনাই অঞ্চল ফেরত পেলেও সিরিয়া তার পশ্চিম গোলান মালভূমি আজও ফেরত পায়নি। ৭ অক্টোবর, ২০২৩ খ্রি. হামাস ইরাঈলে আক্রমণ পরিচালনা করে ৭৫ বছরের নির্যাতনের বদলা ও অবরুদ্ধ গাযযাহকে মুক্ত করার দৃপ্ত শপথে। মুসলিম বিশ্বের একটা সংস্থা আছে ওআইসি (আমি সাধারণত বলে থাকি ওহ! আই সি!) সৌদিআরব সম্মেলন ডেকে ফিলিস্তিনের পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখার আহবান জানায় এবং এর কিছুদিন পরেই আরব লীগের আরেক সম্মেলন ডেকে অনারব রাষ্ট্র তুরস্ক ও ইরান যাতে নাক গলাতে না আসে সেটা নিশ্চিত করে এমবিবিএস। কিন্তু ইসরাঈল ইরানের কনসুলেট ভবনে হামলা চালিয়ে সাতজন ইরানী কূটনীতিক হত্যা করলে ইরান ইসরাঈলে ইতিহাসে প্রথম বার প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে বাধ্য হয়। এ হচ্ছে সহীহ আকিদাহ আর অসহীহ আকিদাহ নামকাওয়াস্তে মুসলিমদের ঈমানী চেতনা। আল্লাহ তাআলা বললেন:
وَمَا  لَكُمْ لَا تُقَٰتِلُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱلْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ ٱلرِّجَالِ وَٱلنِّسَآءِ وَٱلْوِلْدَٰنِ ٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَآ أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ ٱلْقَرْيَةِ ٱلظَّالِمِ أَهْلُهَا وَٱجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَٱجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا 
আর কেনো তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর না এবং নির্যাতিত পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে এই জনপদ থেকে বের করে আনো, যার অধিবাসীরা অত্যাচারী এবং আমাদের জন্য তোমার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নিয়োগ কর এবং আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী নিয়োগ কর তোমার পক্ষ থেকে” (সূরা আন-নিসা-৭৫)।

উপরোক্ত আয়াতে জিহাদের ডাক এসেছে নির্যাতিতদেরকে মুশরিক কাফেরদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য, যারা তাদের উপর ভয়ানক আযাব দেয় এবং তাদেরকে প্রলুব্ধ করে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার। তাই সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলা তাঁর বাণীকে উর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য, তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবার জন্য এবং তাঁর বান্দাদের মধ্যে দুর্বল ঈমানদারদেরকে রক্ষা করার জন্য জিহাদ করা বাধ্যতামূলক করেছেন, যদিও এতে অনেক প্রাণের ক্ষতি হয়। আগের যুগের মুসলমানরা জিহাদ করেছেন শুধু নিজেদের আত্মরক্ষার্থেই নয়, অমুসলিম জালিম শাসক কর্তৃক নির্যাতিত অমুসলিমদেরকে উদ্ধার করার জন্যও তারা জীবন দিয়েছেন। আর আজকের দিনে গায্যার নারী শিশু, বৃদ্ধ, যুবাদের আর্তচিৎকারে যখন বাতাস ভারী তখনও নিদ্রামগ্ন আরব জাতি। নিজেরাতো কিছু করবেই না, অন্য অনারব কোন মুসলিম রাষ্ট্র যাতে কিছু না করে সেটার বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত, কারণ অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান ও তুরস্ক আরব রাষ্ট্রগুলোর বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল। আরবদের গোলামী করা ছাড়া এদের কিইবা করার আছে। আসলে মুসলমান নামটুকু বাকী আছে, মরে গেছে চেতনা।

আজ আর মুসলিম নির্যাতনে চোখে জল আসে না, শরীরে কাপন ধরে না, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটে না, কারণ বহু আগেই ইসলামের স্পিরিচুয়াল পাওয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে, মুসলমান এখন জাগতিক ও বৈষয়িক ধান্ধায় ব্যস্ত সময় পার করছে। রাসূল সা. এর এ বাণী তাই তাদের কর্ণকুহুরে পৌছাচ্ছে না-
عن النعمان بن بشير -رضي الله عنهما- قال: قال رسول الله ﷺ: مثل المؤمنين في توادهم وتراحمهم وتعاطفهم مثل الجسد إذا اشتكى منه عضو تداعى له سائر الجسد بالسهر والحمى[1]. [صحيح] – [متفق عليه]

“মুমিনদের পারস্পরিক ভালবাসা, সহমর্মিতা ও সহানুভূতিতে দৃষ্টান্ত হলো একটি দেহের মত: যদি এর একটি অঙ্গ (ব্যাথার) অভিযোগ করে, তবে শরীরের সমগ্র অংশ নিদ্রাহীনতা এবং জ্বরে ভুগবে।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি, বুখারী-৬০১১, মুসলিম-২৫৮৬)

وجاء في رواية في صحيح مسلم في هذا الحديث أن النبي ﷺ قال: المسلمون كرجل واحد، إن اشتكى عينُه اشتكى كلُّه، وإن اشتكى رأسُه اشتكى كلُّه
সহীহ লে-মুসলিমের অপর বর্ণনায় এসেছে রাসূল সা. বলেছেন: মুসলমানগণ একজন মানুষের মত, যদি তার চোখ (ব্যাথার)অভিযোগ করে, তার সমস্ত শরীর অভিযোগ করে এবং যদি তার মাথা (ব্যাথার) অভিযোগ করে তবে তার সমস্ত শরীর অভিযোগ করে। (মুসলিম, খণ্ড-৪/পৃ.-২০০০, নম্বর-১)।

একতাই বল, ঐক্যবদ্ধতাই নিরঙ্কুশ শক্তির প্রকাশ। আল্লাহ তা’আলা জানালেন:
وَٱعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ ٱللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُواْ ۚ وَٱذْكُرُواْ نِعْمَتَ ٱللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَآءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِۦٓ إِخْوَٰنًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍۢ مِّنَ ٱلنَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمْ ءَايَٰتِهِۦ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
আল্লাহর রুজ্জুকে তোমরা সবাই মিলে দৃঢ়ভাবে ধরো এবং পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হইও না এবং তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে পরষ্পর শত্রু, তিনি তোমাদের অন্তরে প্রীতির সঞ্চার করলেন, ফলে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহে পরষ্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নি-গহবরের প্রান্ত সীমায় ছিলে, অত;পর আল্লাহ তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করলেন। এভাবে আল্লাহ নিজের নিদর্শনাবলী তোমাদের কাছে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা সঠিক পথ প্রাপ্ত হও। ( সূরাহ আলে ইমরান:১০৩)

আমরা যে মুসলমান এ পরিচয় ভুলেই গেছি, আমি এখন স্বাচ্ছন্নবোধ করি আমি সুন্নী, আমি শিয়া, আমি হানাফী, আমি সালাফী, আমি আহলে হাদীস। কাফির শক্তির পা চাটায় আপত্তি নেই, শিয়া মারা গেলে ইন্না লিল্লাহ পড়া জায়েজ নেই কারণ আমি সুন্নী। হায়রে আমার আকিদাহ! কাফির শক্তি যখন তোর পাছার কাপড় খুলে নিচ্ছে তুই বলছিস তুই সুন্নী।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব যখন সফল হলো ১৯৭৯ খ্রি., তখন আকিদাহর ফেরিওয়ালারা নাম দিলো শিয়া বিপ্লব ঠেকাও। ব্যস আর যায় কোথায়? ইরাকের মাথা মোটা সাদ্দামকে লাগিয়ে দেয়া হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, অর্থ, অস্ত্র শস্ত্র সরবরাহ করতে থাকলো আরবের ধনাঢ্য রাষ্ট্রগুলো, কাফিররা পেয়ে গেলো অস্ত্র বিক্রির বাজার এবং সাদ্দাম ফুলে ফেপে বনে গেলো একেবারে নখ দন্ত বিশিষ্ট আরবের বাঘ। যুদ্ধ থামলো, যথার্থই এবার প্রতিদান দেবার পালা এবং একদিন হুট করেই আট ঘন্টায় গিলে ফেললো সাদ্দাম সাহায্যকারী দেশ কুয়েতকে। ব্যস, বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা হুংকার দিয়ে উঠলো- এ কী! সভ্য দুনিয়ায় অসভ্য কাণ্ড! বিশ্ব মানচিত্র থেকে একটা দেশ উধাও হয়ে যাবে? তা কী করে হয়? আল্লামা বিন বায রহ. ফতওয়ার ঢালি সাজিয়ে বললেন: কুয়েত উদ্ধারে কাফির শক্তির সহযোগিতা নেয়া বৈধ, কারণ রাসূল সা. এক যুদ্ধে ইহুদীর বর্ম ধার নিয়েছিলেন। কোথাকার কী পান্তা ভাতে ঘি! রাসূল সা. কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ইহুদীর বর্ম ধার নিয়েছিলেন ১০০% সত্য কথা, কোন মুসলমানকে মারার জন্য নয়। এই হাদীস কী করে দলীল হলো- সাদ্দাম ও তার বাহিনীর শতভাগ সুন্নি মুসলিমকে হত্যার জন্য আমেরিকার কাফির বাহিনীকে ডেকে নিয়ে আসা? আজোও আমার বুঝে আসে না। আমি বুঝি আর না বুঝি, আমেরিকার চালে সাদ্দাম ধরা খেলো, যুক্তরাষ্ট্রের বহুদিনের খায়েশ মধ্যপ্রাচ্যে ঘাটি গড়ে তোলা পূরণ হলো, সৌদির দাহরানে আমেরিকার সেনাবাহিনী চিরস্থায়ী বাসস্থান পেয়ে গেলো। সাদ্দাম উৎখাত হলো সেই সাথে তার চৌদ্দ লক্ষ সেনা সদস্যও, যার অধিকাংশই ব্যাংকারে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে গেলো।

আমেরিকা শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ লাগিয়ে তৈরী করলো আইএসএস, অনেকটা আফগানিস্তানের তালেবান বাহিনী তৈরীর মতো, যাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করলো মোসাদ। একদিন তাদেরকে দিয়ে দাবী তোলা হলো ইসলামী খেলাফতের। এবার আর যায় কোথায়? আইএসএস খতমে নেমে পড়লো আমেরিকা, ইরান সুযোগের সদ্ব্যবহার করলো, ব্যস! সুন্নী অধ্যুসিত ইরাক শিয়া অধ্যুসিত রাষ্ট্রে পরিণত হলো। এ হলো আমাদের সহীহ আকিদাহ বাস্তবায়ন!
আমরা শতধা বিভক্ত। রাসূল সা. এর ভবিষ্যত বাণী ছিল-বনিইসরাঈল ৭২ কাতারে বিভক্ত হয়েছে, আমার উম্মত ৭৩ কাতারে বিভক্ত হবে। এর মধ্যে একটি দলই নাজাত প্রাপ্ত। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় সহীহ আকিদাহর ধারক ও বাহক ইবনে তাইমিয়া তাঁর মাজমু-আল-ফাতওয়া গ্রন্থে যা বলেছেন তা অবিস্মরণীয়, “কেবল সঠিক দলে থাকার কারণে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না কিংবা জান্নাতে সর্বোচ্চ আসন পাবে না। হতে পারে কোন ব্যক্তি ভুল ফিরকায় থাকার পরও ভাল কাজ এবং ইখলাসের কারণে জান্নাতে অধিকতর উচ্চ আসনে দাখিল হতে পারে আবার কেউ সঠিক দলে থেকেও গুনাহ এর কাজে লিপ্ত থাকলে বা অন্তরে অহংকারবোধ থাকলে সে জাহান্নামে যেতে পারে বা জান্নাতে নিম্নতর আসনে দাখিল হতে পারে।”

ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. সাইয়্যেদ ইব্রাহীম রাইসীর অতীত জীবনের কর্মযজ্ঞের জন্য সমালোচিত ছিলেন এ কথা সত্য, কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর ভালো কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শিয়া-সুন্নী আকিদাহগত বিষয়াবলীকে পাশ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে রাজনৈতিক সখ্যতা গড়ে তোলা- সৌদি আরবের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুন:স্থাপন, আজারবাইজানের সাথে সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলা, ফিলিস্তিনের সুন্নী স্বাধীনতাকামী সংগঠনকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি প্রদান ও তা উৎপাদনে সহযোগিতা প্রদান এবং বৈশ্বিকভাবে কূটনেতিক সাপোর্ট প্রদান। প্রথমবারের মতো সরাসরি ইসরাঈলে হামলা পরিচালনার হিম্মত প্রদর্শন এবং জীবনের শেষ কাজ আজারবাইজানের সাথে যৌথভাবে নির্মিত ড্যাম উদ্বোধন। আমরা তাঁর ভালো কাজের বিনিময় প্রত্যাশা করি।

রাইসীর মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা হতে পারে, কিন্তু এর ফলাফল সদূরপ্রসারী মুসলিম জাহানের জন্য এবং বিশেষত ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য। এতে উপকার যা হবার তা হয়েছে আমেরিকা ও ইসরাঈল নামক জারজ রাষ্ট্রের। তারা তাদের বৃহত্তর ইসরাঈল (মিশরের নীল নদের পূর্ব তীর থেকে সিনাই, জর্ডান, সৌদিআরবের মদীনার খায়বার অঞ্চল, ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও কুয়েত নিয়ে) রাষ্ট্র কায়েমের পথের একটা কাটা দূরীভূত হয়েছে বলেই মনে করছে।

আমি আশংকিত (আল্লাহ না করুক) তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদুয়ান মারা গেলে কিংবা তাঁকে হত্যার মাধ্যমে ইসরাঈল তার খায়েশ পূরণে অগ্রসর হলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পাল্টে যেতে পারে। এতে আমেরিকা-ইউরোপ ঐক্যবদ্ধভাবে ইসরাঈলের সাথে থাকবে। কারণ বৃহত্তর ইসরাঈল রাষ্ট্র কায়েম করা তাদের স্বার্থেই জরুরী এবং তাদের বহুদিনের পরিকল্পনাও এটি।

এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক সুবিধা। এতে মিশরের সুয়েজ খালের উপর ইসরাঈলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আসবে এবং লোহিত সাগরের উপর কর্তিত্বলাভ করবে, লেবানন ও সিরিয়া দখলের মাধ্যমে ভূ-মধ্যসাগরের উপর আধিপত্য বিস্তার, ইরাক দখলের মাধ্যমে দজলা-ফোরাত নদীর দখল (যেখানে স্বর্ণের পাহাড় গজিয়ে ওঠার ভবিষ্যত বাণী রয়েছে রাসূল সা. এর) এবং কুয়েত দখলের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ-এ বৃহদ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ইউরোপ-আমেরিকাকে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নিরাপদ নৌপথ দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ সম্পদ লুটপাটের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ব্যবস্থা হবে। এটি করার জন্যই মেরে কেটে ফিলিস্তিন পুরোটা গিলে ফেলার কাজে অন্ধভাবে আমেরিকা সামরিক, অর্থনৈতিক ও কুটনৈতিক সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে ইসরাঈলকে।

এ পরিকল্পনা প্রতিরোধে আমাদের মুসলিম শাসকবর্গের সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধতা প্রয়োজন, অথচ আমরা পড়ে আছি আকিদাহ নিয়ে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আলে সৌদ বংশও খতম হয়ে যাবে, যার ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করে ফেলেছে। একশ বছরের হিসেবেও সেটা অনুমেয় (১৯৩২-২০৩২ খ্রি.)।

মক্কা-মদীনার হেফাযতকারী আল্লাহ তা’আলা। তাঁর ফয়সালা কী তিনিই ভালো জানেন। আমাদের প্রার্থনা ইসলামের সূতিকাগারসহ গোটা মুসলিম দুনিয়াকে আল্লাহ যেনো গায়েবী মদদে রক্ষা করেন এবং শুধু আকিদাহ নয়, পুরো ঈমানী চেতনার উন্মেষ যেনো ঘটান। আমি যেনো গর্বভরে বলতে পারি আমি একজন মুসলমান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *