আল কুরআন ও মানব দর্শন

আল কুরআন ও মানব দর্শন

আল কুরআন ও মানব দর্শন বিষয়টি দেখে আমরা প্রথমে চমকে উঠব। আল কুরআন তো একটি ধর্মীয় গ্রন্থ । এখানে আবার মানব দর্শনের কি আছে?

এ ধরনের প্রশ্ন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, আমরা যারা ধর্মকে শুধু বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান, কোনো পার্বণ, নির্দিষ্ট কোনো স্থানে গমন, আনন্দ উদযাপনকে বুঝে থাকি, তাহলে তাদের কাছে ইসলাম ধর্মকে নিছক অন্যান্য ধর্মের মতই মনে হবে।

কিন্তু ইসলাম ধর্ম তো অন্যান্য ধর্মের মত নিছক কোনো ধর্মের নাম নয়; এটি একটি জীবন ব্যবস্থার নাম। আর জীবন ব্যবস্থা হলো আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের জন্য। ধর্মও তাদের জন্যই।তাই আল কুরআনের আলোচ্য বিষয় মানুষ হবে এটাই স্বাভাবিক।

মানুষ পরিচিতি:
বাক ও বোধসম্পন্ন দু’পা বিশিষ্ট প্রাণীই মানুষ। আর মানতিক তথা ইসলামী তর্কশাস্ত্রে মানুষকে হায়ওয়ান নাতিক বা বাকসম্পন্ন জীবকে মানুষ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

মানুষ ধর্মকে ধারণ করবে, লালন করবে, পালন করবে, এর মাধ্যমেই তার পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনকে ধন্য করবে। এটাই ধর্মের উদ্দেশ্য।

এজন্য ইসলাম ধর্মের মৌলিক সংবিধান ঐশী গ্রন্থ আল কুরআনের বিষয়বস্তু হিসেবে মানবজাতিকেই নির্ধারণ করা হয়েছে।

মানুষ তার ইহলৌকিক জীবনকে নির্ধারিত বিধি-বিধানের আলোকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে পারলৌকিক জীবনকে কৃতকার্য করবে, এটাই ধর্মীয় গ্রন্থ আল কুরআনের মূল উদ্দেশ্য।

মানুষ তার জীবনকে সঠিক লক্ষে পৌছাতে এবং নিজেকে পরিচালনা করতে যেসব নির্ধারিত আইন-কানুন বিধি-বিধান অধ্যাদেশ পালন করা অত্যাবশ্যকীয়, তাই হলো ইসলামী দর্শন।

মানুষ ব্যক্তি হিসেবে তার নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে, এটি হলো ব্যক্তি দর্শন। মানুষ যে ঘরে জন্মগ্রহণ করে, এটি হলো তার পরিবার। এজন্য তার পরিবারেও রয়েছে একটি দর্শন। যেটা হলো পারিবারিক দর্শন।

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ছাড়া সে বাঁচতে পারে না। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের রয়েছে সমাজ দর্শন।

মানুষ নির্ধারিত একটি ভূখণ্ডে বসবাস করে, যেটি রাষ্ট্র নামে অভিহিত। তাই তার রয়েছে একটি রাষ্ট্রীয় দর্শন।

মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে পরস্পরের সাথে মুআমালাত তথা আচার-ব্যবহার লেনদেন উঠাবসা চলাফেরা কথাবার্তা ইত্যাদি কেমন হবে, এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ আল কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে।

পারিবারিক জীবন দর্শন:
মানুষ তার পরিবারে একাকী বসবাস করে না। তার পরিবারে থাকে দাদা-দাদি, নানা-নানী, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, শশুর-শাশুড়ি, ফুফা-ফুফু, খালা-খালু, চাচা-চাচি, ভাই-ভাবি, বোনজামাই-বোন, ভাগ্নি-ভাগ্নে, ভাতিজা-ভাতিজি, সন্তান-সন্ততি, ছেলে-মেয়ে।

পরিবারের জনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে এদেরকে রীতি মোতাবেক পরস্পরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। এদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করা হাদিসের নির্দেশ। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী রাসুলের উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। সামর্থ্য থাকার পরেও যে বিয়ে-শাদী না করে, সে রসুলের উম্মত নয়। এটিই ইসলামী দর্শনের মূল কথা।

সামাজিক জীবন দর্শন:
মানুষ সামাজিক জীব হওয়ায় তাকে একটি সমাজে জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বসবাস করতে হয়। সমাজ জীবনে যে কোনো কাজে তাকে প্রথমে প্রতিবেশী এরপর অন্যান্য নিকটতম ও দূরত্ব আত্মীয়স্বজনের সাথে মেলামেশা, লেনদেন করতে হয়। আচরণে কেউ কাউকে কষ্ট দিবে না, কারো প্রতি কেউ জুলুম অত্যাচার করবে না। করবে না কারো প্রতি অবিচার। লেনদেনে করবে না কম-বেশি। তাহলে সে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে না। এটাই ইসলামী দর্শনের মূলনীতি।

রাষ্ট্রীয় জীবন দর্শন:
সমাজ জীবনের উপর মানুষের আরও বড় পরিসরে তাকে চলাফেরা, ওঠাবসা করতে হয়, সেটা হলো রাষ্ট্রীয় জীবন। রাষ্ট্রীয় জীবনে একজন নাগরিকের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান কে হবেন, তার কি কি গুণ থাকা দরকার, কিভাবে তিনি দেশ পরিচালনা করবেন, কর, খাজনা, ট্যাক্স, যাকাত, ওসর, ফেতরা কিভাবে উসূল করবেন এবং সে অর্থ দেশ পরিচালনায় কিভাবে ব্যয় করবে ইত্যাদির সকল বিবরণ আল কুরআনে আভাসে-ইঙ্গিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

এতদ আলোচনায় এ বিষয়টি আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়েছে যে, আল কুরআনের মূল আলোচ্য বিষয় হলো মানুষ। মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত কিভাবে তার জীবনকে পরিচালনা করবে বিস্তারিত বিবরণ আল কুরআনে এসেছে।

ইরশাদ হচ্ছে,
ما فرطنا في الكتاب من شيء
(আমি আল কুরআনে কোনো কিছুর বিবরণ বাদ রাখিনি ।)

আরো ইরশাদ হচ্ছে,
وكل شيء فصلناه تفصيلا
(আমি প্রতিটি বিষয়ের সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছি।)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআনী দর্শন অনুযায়ী জীবন যাপন করার তৌফিক দান করুন আমিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *