গাযযাহ হিয়াল ইজ্জাহ (গাজাই প্রকৃত সম্মান)

গাযযাহ হিয়াল ইজ্জাহ (গাজাই প্রকৃত সম্মান)

|| প্রফেসর ড. মো: ময়নুল হক, ইবি ||

শত শত নবী রাসূলের পদভারে ধন্য যে ভূমি তার নাম ফিলিস্তিন। রাসূল সা. এর মিরাজের স্মৃতিবিজড়িত মাসজিদুল আকসা মুসলমানদের প্রথম কিবলা, যেখানে একটি সালাত আদায় করলে দুই শত পঞ্চাশ সালাতের সওয়াব পাওয়া যায়। পৃথিবীতে তিনটি মাসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করাকে বৈধ বলেছেন রাসূল সা.- মাসজিদুল আকসা তার একটি।

ওমার ইবনুল খাত্তাব রা. এর শাসনামলে এ অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীনে আসে। কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের আবারো নজর পড়ে ফিলিস্তিনের দিকে। আমরা জানি গাজী সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী (রহ.) বহু যুদ্ধে এসব ক্রুসেডারদের পরাস্ত করেন এবং প্রতিবারই তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।

সর্বশেষ উসমানীয় খেলাফতের চারশত বছর নিরঙ্কুশভাবে ফিলিস্তিন ছিল মুসলিম শাসনাধীন অঞ্চল।
আমাদের ভাষায় যাকে গাজা বলে জানি, তা আরবদের কাছে পরিচিত গাযযাহ হিসেবে। আর এই অঞ্চলটিই ফিলিস্তিনবাসীর ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করে চলেছে। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে- গাযযাহ হিয়াল ইজ্জাহ (গাজাই প্রকৃত সম্মান)।

ভূমধ্য সাগরের তীর ঘেষে ইসরাইলী দখলমুক্ত ছোট্ট (দৈর্ঘ ৩৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৬ কিলোমিটার) একটি অঞ্চল গাজা। যার দক্ষিণে মিসরেরর সিনাই এলাকা এবং রাফাহ হচ্ছে এর প্রবেশ দ্বার। ৩৬ লক্ষ মুসলিমের বসবাস এখানে। এতে হামাস সংগঠন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে।

গাজার মাঝখানে ইসরাইল, তার উত্তর-পূর্ব অংশ পশ্চিম তীর যেখানে ইসরাইলী পুলিশ পাহারায় মাহমুদ আল-আব্বাসের আল-ফাতাহ সংগঠন সরকার পরিচালনা করে আসছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নামে। ফিলিস্তিনের স্বাধীন অঞ্চল বলতে তাই গাজাকেই বুঝানো হয়। এটাই আরবদের ইজ্জত। কিন্তু এর চারপাশ ঘিরে রেখেছে ইসরাইল নামক জারজ রাস্ট্রের সেনাবাহিনী। আন্তর্জাতিক সমুদ্র সীমানাটুকুও দখল করে রেখেছে তারা।

এ অঞ্চল থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ রাফাহ সীমান্ত চৌকি। মিশর হয়ে অন্য দেশে যেতে হয়, এমনকি ফিলিস্তিনের অন্য অংশেও যেতে এর কোন বিকল্প পথ নেই। গাজা চার দেয়ালে অবরুদ্ধ জনপদ। গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের সংযোগ দখলদার ইসরাইলের দখলে যে কোন অজুহাতে যখন খুশি তারা তা বন্ধ করে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল (১৯১৪-১‌৯১৬ খ্রি.) বৃটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ান সাম্রাজ্যের সাথে জার্মানী ও হাঙ্গেরী-অস্ট্রিয়ার মধ্যে এবং উসমানীয় খেলাফত শেষের দিকে দ্বিতীয় পক্ষের সাথে এ যুদ্ধে অংশ নেয় এবং পরাজিত হয়।

বিজয়ী শক্তি আরব জাতীয়তাবাদ ও তুরানী (তুরস্ক) জাতীয়তাবাদের দ্বান্দিক অবস্থার সুযোগ নিয়ে উসমানীয় খেলাফতের পতন ঘটায় এবং আরব অঞ্চলগুলো ফ্রান্স ও বৃটেনের দখলে চলে যায়। অন্যান্য অঞ্চলগুলো বৃটিশ নিয়োগ প্রাপ্ত আরব গভর্ণর কর্তৃক পরিচালিত হলেও ফিলিস্তিনকে বৃটিশরা সরাসরি নিজেদের শাসনে রাখে এবং ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নেয়।

১৯১৭ সনের ২ নভেম্বর বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর বৃটেনের জায়নবাদীদের লিডারের নিকট পত্রের মাধ্যমে জানায় প্যালেস্টাইনে “national home” for the Jewish people, ইহুদীদের জন্যে জাতীয় ভূমি দেয়া হবে এবং তা ৯ নভেম্বর বৃটেনের “দি টাইমস‍” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। জমির মালিক কে, আর দান করে কে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাতিসংঘ গঠিত হলে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের ৪৮শতাংশ ভূমি নিয়ে স্বাধীন ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রস্তাব উত্থাপন করে বৃটেন এবং তা পাশ হয়। পাশ হওয়ার পর দিনই ইসরাইল বৃটিশ সেনাদের সহযোগিতায় দশ লক্ষাধিক মুসলমানকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করে প্রতিশ্রুত ভূমির চেয়ে বেশী অঞ্চল দখল করে নেয়। আরবরা এ অসম বন্টনকে মেনে নিতে না পেরে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, কিন্তু দখলদার বৃটিশ সেনবাহিনীর কাছে পরাস্ত হয়।

বৃটিশরা চলে গেলেও ফিলিস্তিনবাসী স্বাধীনতার জন্য লড়তে থাকে এবং ১৯৬৭ সনে আরব-ইসরাইল পুনরায় যুদ্ধ বাধে । আমেরিকার সরাসরি হস্তক্ষেপে ইসরাইল এ যুদ্ধে আরবদেরকে পরাস্ত করে এবং মিশরের সিনাই, সিরিয়ার পশ্চিম গোলান মালভুমি, মাসজিদে আকসাসহ ফিলিস্তিনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে নেয় তারা। পরবর্তী সময়ে ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বীকৃতিসহ সন্ধি চুক্তির আওতায় মিশর সিনাই অঞ্চল ফেরত পায়। সিরিয়ার পশ্চিম গোলান মালভুমি এখনো ইসরাইল জবর দখল করে রেখেছে। আর ফিলিস্তনীদেরকে ইসরাইলী নাগরিক বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় ইব্রাহীমি চুক্তির আওতায় বাহরাইন, আরব আমিরাত ও সৌদির সাথে ইসরাইল সম্পর্ক উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়, যদিও সৌদি আরব এখনও চুক্তি স্বাক্ষর করেনি।
বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের ঔরসে জন্ম নেয়া অবৈধ দখলদার জায়নবাদী জারজ রাষ্ট্র ইসরাইলের মূল লক্ষ্য হলি ল্যান্ড-ইরাক থেকে মিশর- কব্জা করার মিশন বাস্তবায়নে সচেষ্ট।

জায়নিষ্টদের চেতনাপুষ্ট ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইল। ইহুদীরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তু হয়ে ফিলিস্তিনে এসে একদিন আশ্রয় নিয়েছিল, কালের পরিক্রমায় আশ্রয়দাতাদেরকেই গিলে ফেলছে।

হিটলারের হাতে তারা চরম মার খেয়েছিল। লক্ষ লক্ষ ইহুদীকে মেরে হিটলার বলেছিল: আমি সব ইহুদীকে মেরে ফেলতে পারতাম কিন্তু তা করিনি। কারণ, পরবর্তী প্রজন্ম যাতে বুঝতে পারে কেনো আমি ইহুদী হত্যায় মেতে উঠেছিলাম। ইহুদী জাতি বিশ্বাসঘাতক। কুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে- ইহুদীরা অভিশপ্ত জাতি।

ইউরোপ থেকে বিতাড়িত হয়ে যারা নি:স্ব, অসহায় অবস্থায় ফিলিস্তিনে আশ্রয় পেয়েছিল, আরব মুসলিমরা থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, তাদেরকেই তারা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে উদ্বাস্তু বানিয়ে ছেড়েছে। নিজভূমে পরবাসী ফিলিস্তিনীরা যখন মাতৃভূমি রক্ষায় এবং ৫৬ বছরের অবরুদ্ধ অবস্থার অবসানে ইট-পাটকেল আর অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, তখন তাদেরকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে পৈশাচিকভাবে বৃদ্ধ, শিশু, নারী-পুরুষ সাধারণ জনগণের উপর বোমা বর্ষণ করে ইসরাইল তার শক্তিমত্তার জানান দিচ্ছে।

আর বিশ্ব মোড়লরা (আমেরিকা ও ন্যাটোভুক্ত দেশসমূহ) বলছে, হামাস সন্ত্রাসী সংগঠন এবং ইসরাইলের নিজেকে রক্ষার অধিকার রয়েছে। ইসরাইল নামক কোন রাষ্ট্র ১৯৪৮ সনের আগে পৃথিবীতে ছিল কী? ফিলিস্তিনে কয়জন ইহুদী বাস করতো? মানবাধিকারের ধ্বজাধারীদের বোধদয় কবে ঘটবে? কবে ঘুম ভাঙ্গবে আরব রাজাদের? ইরাক থেকে মিশর যাকে যায়নবাদীরা বলছে হলি ল্যান্ড, সেটা কায়েম হওয়ার পর মুসলিম উম্মাহর তন্দ্রা চলে যাবে? আমরা শান্তি প্রত্যাশী এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। ১৯৬৭ পূর্ব সীমা রেখার ভিত্তিতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হোক।

লেখক:
প্রফেসর ড. মো: ময়নুল হক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), কুষ্টিয়া।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *