তারাবিহের সালাতে কুরআন তিলাওয়াত ও খতম

তারাবিহের সালাতে কুরআন তিলাওয়াত ও খতম

পবিত্র কুরআনুল কারিম নাযিলের মাস মাহে রমযান। এ ব্যাপারে কুরআনুল কারিমের সুরা বাকারাহ এর ১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, “রমযান মাস, এ মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।” তাই রমযান মাসেই কুরআন তিলাওয়াত ও খতমে সাওয়াব অত্যন্ত বেশি। কুরআন তিলাওয়াত এর ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবি ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআনের একটি বর্ণ পাঠ করবে সে একটি নেকি অর্জন করবে। নেকি দশগুণ বৃদ্ধি করে প্রদান করা হবে। আমি বলছি না যে, (আলিফ-লাম-মিম) একটি বর্ণ। বরং ‘আলিফ’ একটি বর্ণ, ‘লাম’ একটি বর্ণ ও ‘মীম’ একটি বর্ণ।” হাদিসটি সহিহ। (জামে তিরমিযি)।

মহাগ্রন্থ কুরআন আল্লাহ তাআলার নিকট পাঠকারীর জন্য শাফাআত করবে। এ প্রসঙ্গে আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা কুরআন পাঠ করবে; কারণ কুরআন কিয়ামতের দিন তার সঙ্গিদের (কুরআন পাঠকারীগণের জন্য) শাফাআত করবে।” (সহিহ মুসলিম)

অতএব, বলা যায় যে, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত নফল ইবাদত হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা মহান আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের অন্যতম পন্থা। তাই প্রত্যেক মুসলমানেরই উচিত সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতিতে যথাযথভাবে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা।

কুরআন নিয়মিত ধীর স্থিরভাবে তিলাওয়াত করা এবং এর মর্ম বুঝে তদানুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআন তিলাওয়াত পদ্ধতি সম্পর্কে আনাস রা. বলেন, “তাঁর কিরাআত ছিল, টেনে টেনে।” (সহিহ বুখারি)

কুরআন ধীরে ধীরে আরবি ভাষার রীতিতে বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর নির্দেশ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত অনুসারে তিলাওয়াত করতে হবে। আরবি ভাষায় প্রতিটি বর্ণের উচ্চারণ স্থল, উচ্চারণ পদ্ধতি, মদ, গুন্নাহ ও অন্যান্য উচ্চারণের নিয়মাবলি অনুসরণ করে সাধ্যমত মধুর ও সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করতে হবে। বাংলা উচ্চারণে কুরআন পাঠ কখনই তিলাওয়াত বলে গণ্য হবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “এবং ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট ও সুন্দরভাবে কুরআন আবৃত্তি করুন।” (আল কুরআন, সুরা মুয্যাম্মিল আয়াত ৪) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইবনু কাসীর তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসিরুল কুরআনিল আযিম’ এ উল্লেখ করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা., মুজাহিদ, আতা, হাসান বসরি, কাতাদাহ ও অন্যান্য সাহাবি ও তাবেয়ি প্রমুখ মুফাসসিরগণের মতে, তারতীল অর্থ কুরআনকে ধীরে ধীরে, শান্তভাবে, সুস্পষ্ঠ করে ও টেনে টেনে পড়া, যেন তা বুঝা ও এর অর্থ চিন্তা করা সহজ হয়। (তাফসির ইবনু কাসির)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তিলাওয়াত পদ্ধতি সম্পর্কে আয়েশা রা. বলেন, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের সুরা তিলাওয়াত করলে তারতিলসহ তথা ধীর ও শান্তভাবে তিলাওয়াত করতেন, ফলে সুরাটি যতটুকু লম্বা এর চেয়ে অনেক বেশি লম্বা হয়ে যেত।” (সহিহ মুসলিম)

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন, “তোমরা কুরআনকে কবিতার মত আবৃত্তি করবে না বা সস্তা খেজুর ছিটিয়ে দেওয়ার মতো ছিটিয়ে দেবে না। কুরআনের আশ্চর্য বাণী থেমে ও বুঝে পড়বে। কুরআন দিয়ে হৃদয়কে নাড়া দেবে। কখন খতম হবে বা কখন সুরার শেষে পৌঁছাবে এ চিন্তা করে কখনো কুরআন তিলাওয়াত করবে না।” (তাফসির ইবনু কাসির)

বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও ধীরে ধীরে টেনে পড়ার সাথে যথাসম্ভব সুন্দর ও মধুর স্বরে তিলাওয়াতের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উৎসাহিত করেছেন, বারা ইবনু আযিব রা. বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা কুরআনকে তোমাদের কণ্ঠস্বর দিয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত কর।” হাদিসটি সহিহ। (সুনান আন-নাসাই)

কুরআন ও হাদিসের উপরিউক্ত নির্দেশনায় প্রতীয়মান হয়, সুন্নাহ নির্দেশিত পদ্ধতিতে ধীর স্থিরভাবে যথাযথ মধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। তাই মনোযোগের সাথে সুন্নাহ সম্মতভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য। অতি দ্রুততার সাথে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত কুরআনুল কারিমের প্রকৃত তাৎপর্যের পরিপন্থি। এ সম্পর্কে যাবের রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করলেন। এমতাবস্থায় কিছু লোক কুরআন পাঠ করছিল। তিনি বললেন, তোমরা কুরআন পাঠের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করো এমন সম্প্রদায় নির্গত হওয়ার পূর্বে, যারা কুরআনকে তীরের মতো ঠিক করবে। (অর্থাৎ তাজবিদ নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে) তা দ্রুত গতিতে পাঠ করবে, ধীর স্থিরভাবে পাঠ করবে না।” (আহমদ ইবনু হাম্বল)

কুরআন দ্রুতগতিতে তিলাওয়াত করে সাওয়াবের আশা করা বিধিসম্মত নয়। বিধায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধরনের তিলাওয়াতকে সমর্থন করেননি। তাই কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে এরূপ পদ্ধতি অবশ্যই বর্জনীয়। রমযান মাসে তারাবিহের সালাতের মধ্যে পবিত্র কুরআন খতম তথা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ধীরেস্থিরে তাজবিদের নিয়ম অনুসরণ করে তিলাওয়াত করা সীমাহীন সাওয়াবের কাজ।

কুরআন সম্পূর্ণটা তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে খতম শব্দের প্রয়োগ সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহমান দারিমি তাঁর সংকলিত গ্রন্থ ‘আস-সুনান’ এ খাতুমুল কুরআন নামে একটি অনুচ্ছেদের নামকরণ করেন। উক্ত অনুচ্ছেদে বিবৃত হাদীসে খতম শব্দের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। কুরআন খতমের গুরুত্ব সম্পর্কে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আবু দারদা রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি দিনে কুরআন খতম করে ফেরেশতারা সন্ধ্যা পর্যন্ত তার জন্য দুআ করতে থাকেন। আর যদি রাতে কুরআন খতম করে ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত তার জন্য দুআ করতে থাকেন”(সুনানে দারিমী)। সুতরাং তারাবিহের সালাতে কুরআন তিলাওয়াত ও খতমের ক্ষেত্রে সুন্নাহের যথাযথ অনুসরণ অত্যাবশ্যক। কিন্তু এক্ষেত্রে কুরআন খতমের সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়টি আমাদের সমাজে খুব কমই পরিলক্ষিত হয়। কুরআন খতমের জন্য প্রয়োজনীয় সময় সম্পর্কে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে কমপক্ষে তিনদিন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাতে ধীরে স্থিরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন বলে হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি। কুরআনের প্রতিটি পারার জন্য কমপক্ষে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে তিলাওয়াত করলে মোটামুটি ধীর স্থিরভাবে চিন্তা করে তিলাওয়াত করা যায়। আর ৩৫-৪০ মিনিটে তিলাওয়াত করলে আশা করা যায় যে, এতে তিলাওয়াতের হক আদায় হয়ে যাবে।

আমাদের সমাজে তারাবিহের সালাতের সংখ্যা নিয়ে বিদ্যমান বিতর্ক মোটেও কাম্য নয়। কিন্তু তারাবিহের সালাতে কুরআন তিলাওয়াতের সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি অনুসরণ হচ্ছে কি না এ বিষয়ে তেমন একটা আলোচনা দেখা যায় না। অনেকের মধ্যে এমন মনোভাব পরিলক্ষিত হয় যে, তারাবিহ মানে তাড়াতাড়ি তিলাওয়াত। আমাদের দেশের অধিকাংশ মসজিদে এতই দ্রুত তিলাওয়াত করা হয়, যা শ্রোতা হিসেবে অনেক কুরআনে হাফিযেরও পুরোপুরি লক্ষ্য করা কষ্টকর হয়। শহরাঞ্চলের কিছু কিছু মসজিদে ধীর স্থিরভাবে তিলাওয়াত করতে দেখা যায়। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মসজিদে এত দ্রুত তিলাওয়াত করা হয়, যা লক্ষ্য করা একেবারেই কঠিন।

যেখানে ধীর স্থিরভাবে, চিন্তা করে তিলাওয়াত করলে এক পারা তিলাওয়াতে এক ঘণ্টা সময় দরকার সেখানে দেখা যায় এক ঘণ্টার মধ্যেই ইশা ও বিতরসহ বিশ রাকাআত তারাবিহের নামায শেষ হয়ে যায়। হিসাব করে দেখা যায় যে, বিশ রাকাআত তারাবিহের নামাযে মোটামুটি ধীরে স্থিরে সানা, রুকু, সিজদাহ, কওমা, জলসা ও শেষ বৈঠক আদায় করতেই প্রায় ২২ মিনিট সময় ব্যয় হয়। আর এক পারা কুরআন তাজবিদের সাথে হদর পদ্ধতিতে তিলাওয়াত করলে প্রায় ৪০ মিনিট সময় ব্যয় হয়। ইশার ফরজ, সুন্নত ও বিতর নামায আদায়ে প্রায় ১৮ মিনিট সময় ব্যয় হয়। তারাবিহের প্রতি চার রাকাআত পর পর সমপরিমাণ সময় বিশ্রাম করা মোস্তাহাব। (বেহেশতি জেওর) তারাবিহের চার রাকাআত নামায আদায় করতে প্রায় ১২ মিনিট সময় ব্যয় হয়। তাই সুন্নাহ সম্মতভাবে কুরআন তিলাওয়াত করলে ও বিরতিতে মুস্তাহাব পদ্ধতি অনুসরণপূর্বক তারাবিহের নামায আদায় করলে ইশা ও বিতর সহ প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় হওয়ার কথা। হারামাইন শারিফাইনে তারাবিহ আদায়ের পদ্ধতি পর্যালোচনা করলে এমন চিত্র ফুটে উঠে।

নামাযে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের কষ্ট হওয়া বা মুসল্লি কম হওয়ার আশংকায় চার রাকাআত অন্তর অন্তর বিরতিতে মুস্তাহাব পদ্ধতি অনুসরণ না করে নামায আদায় করলে এবং তিলাওয়াত তাজবিদের যথাযথ অনুসরণে ধীরে স্থিরে আদায় করলে ইশা ও বিতরসহ দেড় ঘণ্টারও অধিক সময় ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক মসজিদে এত দ্রুত তিলাওয়াত করা হয় যা সুন্নাতের পরিপন্থী। ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুমে বলা হয়েছে যে, তারাবিহ নামাযে এত দ্রুত তিলাওয়াত করা যে বুঝে আসে না এরূপ তিলাওয়াতে সাওয়াবের পরিবর্তে গোনাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (আহকামে যিন্দেগী) এরকম তিলাওয়াত মোটেও কাম্য নয়।

হারাম শরিফের ইমাম শায়খ আব্দুর রহমান সুদাইসী দামাতবারাকাতুহু-এর তিলাওয়াত শ্রবণে পরিলক্ষিত হয় যে, তাঁর এক পারা তিলাওয়াতে ৩৭ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড ব্যয় হয়েছে। শায়খ মিশারি বিন রশিদ আল আফাসি দামাত বারাকাতুহু এর এক পারা তিলাওয়াত শ্রবণে পরিলক্ষিত হয় যে, তার এক পারা কুরআন তিলাওয়াতে ব্যয় হয়েছে ৫৪ মিনিট ২৮ সেকেন্ড। সুতরাং তিলাওয়াতকারীকে অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত যাতে করে তিলাওয়াতের তিন পদ্ধতির (তারতীল, তাদবির, হদর) কোনো একটি পদ্ধতিতে তিলাওয়াত হয়। অতএব, খতম তারাবিহ এ তিলাওয়াতের বেলায় রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিত পন্থা অবলম্বন জরুরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবদ্দশায় তারাবিহের সালাত আদায়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন মর্মে হাদিসে বর্ণিত। সুতরাং এ থেকে বুঝা যায় যে, তারাবিহের সালাত ধীরে স্থিরে তিলাওয়াতের মাধ্যমে আদায় করলেই সুন্নাত পদ্ধতির অনুসরণ হয়। ধীরে স্থরে কুরআন তিলাওয়াত করা আমাদের কর্তব্য।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *