প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মো. ময়নুল হক শিক্ষাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র

প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মো. ময়নুল হক শিক্ষাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র

||মো. ওসমান গনি||

দেশের ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বনামধন্য বিভাগ আল-হাদীস এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ। বিভাগটির অন্যতম সিনিয়র অধ্যাপক, প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ, জ্ঞানতাপস, অধ্যাপক ড. মো. ময়নুল হক। যিনি শিক্ষাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অধ্যাপক হক আলোর বাতিঘর হয়ে জ্ঞানের দ্যুতি বিচ্ছুরণ করে যাচ্ছেন স্বার্থহীনভাবে।

আধুনিক যুগে ইসলামী শিক্ষার উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগটিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি তাঁর মেধা, মনন, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ তৈরির পাশাপাশি দক্ষতার সাথে ইসলামী শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বিভাগীয় উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাঁর হাত ধরেই বিভাগীয় শিক্ষা কারিকুলামে পরিবর্তন এসেছে, বিভাগ পেয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া।

অধ্যাপক ময়নুল হক শিক্ষাগুরু হিসেবে নীতি-আদর্শের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-আদর্শ সর্বমহলে সুপ্রতিষ্ঠিত। আদর্শবান এ প্রাণপুরুষের সাহচর্য পেয়ে গুণী মানুষে পরিণত হয়েছেন অনেকেই।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও চৌকষ। ইসলামিক শিক্ষায় পাণ্ডিত্য অর্জনের পাশাপাশি তিনি যুগের চাহিদায় আধুনিক জ্ঞান রপ্ত করে সমৃদ্ধ করেছেন নিজেকে।

শিক্ষাজীবনের সর্বস্তরেই মেধার স্বাক্ষর রেখে স্বর্ণসাফল্য অর্জন করেছেন অধ্যাপক হক। ১ম বিভাগ, বোর্ড স্ট্যান্ড, অনার্স ও মাস্টার্সে ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান, ফ্যাকাল্টি ফার্স্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি, চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল লাভ, হাইয়ার ডিপ্লোমায় এক্সিলেন্ট অর্জন করে কৃতিত্ব গড়েছেন একের পর এক। ‘আল-কুরআন ও আল-হাদীসের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ বিষয়ে গবেষণা করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি. ডিগ্রি অর্জন করেন ২০০১ সালে। তাঁর এ গবেষণাকর্মটি সর্বমহলে নন্দিত ও সমাদৃত।

অধ্যাপক ড. মো. ময়নুল হক দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের রিলিজিয়াস সায়েন্স অনুষদের অধীনস্ত ইসলামিক স্টাডিজ এণ্ড দাওয়াহ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে চাকুরী জীবনে প্রবেশ করেন ১৯৯৪ সালের ১ জুলাই। হাইয়ার ডিপ্লোমার ৫জন মিশরীয় শিক্ষকের সান্নিধ্যে শিক্ষকতা জীবনের ১ বছর পাঁচ মাস অতিবাহিত করে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে যোগদান করেন বর্তমান কর্মস্থল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলোজী এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদভুক্ত আল-হাদীস এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিটিআই থেকে টিচিং মেথডোলোজির ওপর দু’ সপ্তাহের ট্রেনিং সমাপ্ত করেন। ২০০৭ সালে তিনি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং ১ জুলাই, ২০১৭ সাল থেকে অধ্যাপক (গ্রেড ওয়ান) পদে কর্মরত আছেন।

এছাড়াও তিনি ১৫তম জেনারেল বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেছিলেন।

অধ্যাপক হক ২০০৫ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত (তিন বছর) দক্ষতার সাথে বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভাগীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার বুনিয়াদ রচনা করেন। তাঁর সময়কালে ব্যাপকভাবে বিভাগীয় উন্নতি সাধিত হয়। এ সময় তিনি ছাত্রকল্যাণে সুসজ্জিত সেমিনার লাইব্রেরি ও আধুনিক মানের কম্পিউটার ল্যাব চালু করেন। শিক্ষার্থীদের পঠনপাঠনের সুবিধার্থে বিভাগটিতে তিনিই প্রথম শুরু করেন প্রজেক্টর ভিত্তিক ক্লাস। তাঁর প্রাণবন্ত ক্লাসে শিক্ষার্থীরা থাকে উচ্ছ্বসিত, উপভোগ করে পুরো সময়। শিক্ষার্থী-বান্ধব ও ছাত্রকল্যাণে নিবেদিত এ প্রাণপুরুষ শিক্ষকতার মহান পেশাকে জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে মেধা ও শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীদের প্রিয় মুখ।

তাঁর সময়কালে আল-হাদীস ও দাওয়াহ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে আরবীতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বরেণ্য এই শিক্ষাবিদ (অধ্যাপক ড. মো. ময়নুল হক)। আর অনুষ্ঠানটির মূল আকর্ষণ ছিলেন তাঁরই শিক্ষাগুরু মিশরীয় প্রফেসর মুহাম্মদ আল-সাইয়্যদ আল-সাইয়্যেদ আল-ছাফতী। বিভাগীয় চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি কঠোর পরিশ্রম করে আল-হাদীস বিভাগকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি আদর্শ বিভাগ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

প্রফেসর ময়নুল হক, হল প্রশাসন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত অনেক দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন। বিভাগ ও অনুষদের শিক্ষকবৃন্দকে Teaching Methodology ওপর ট্রেইন্ড আপ করানোর যে স্বপ্ন তিনি বুকে লালন করতেন, ২০১১ খ্রিস্টাব্দে তা বাস্তবায়নের সুযোগ পান যখন তাঁরই একটি সাব-প্রজেক্ট হেকেপের ১ম রাউন্ডের প্রতিযোগিতায় এওয়ার্ড লাভ করে। ২০১১ সালের মার্চ থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত দু’বছরে হেকেপ ও ইউজিসির সহযোগিতায় সাব-প্রজেক্ট সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন। এর কর্ম-পরিধির আওতায় সমৃদ্ধ কম্পিউটার ল্যাবসহ বিভাগের উন্নয়ন ঘটান এবং অনুষদভুক্ত শিক্ষকবৃন্দের মানোন্নয়নে দু’সপ্তাহের Teaching Methodology ওপর এবং এক সপ্তাহের Computer Application ওপর ট্রেনিং এবং অনুষদভুক্ত এমফিল ও পিএইচডি. গবেষকবৃন্দের জন্য Research Methodology ওপর এক সপ্তাহের ট্রেনিং সফলভাবে সমাপ্ত করতে সক্ষম হন। এসব ট্রেনিং প্রোগ্রামের কোর্স কো-অর্ডিনেটর ও কোন কোন ক্ষেত্রে ফেসিলিয়েটেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

প্রফেসর হক, শিক্ষা ও গবেষণায় অনবদ্য অবদান রেখে চলেছেন। ইসলামের নানা বিষয়ে তাঁর অনেক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়ে পাঠক সমাজে প্রশংসিত হয়েছে। দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবনাও তাঁর অনেক গভীরে। লিখেছেন অনেক নিবন্ধও। এছাড়াও ইলমে হাদীসের ওপর রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ মাদরাসার উচ্চশিক্ষা স্তরের সিলেবাসভুক্ত। এ থেকে জ্ঞানার্জন করে সমৃদ্ধ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তাঁর পিএইচডির একাংশের ওপর প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষয় নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ইসলাম; পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন শিরোনামে বই প্রকাশ করে। বাজারে বইটির চাহিদা এত ব্যাপক যে তৃতীয় প্রিন্টও শেষ হয়েছে। এ গবেষকের ক্ষুরধার লেখনী আজ জ্ঞান পিপাসুদের যেন অমৃত খোরাক।

সিলেবাস ও ক্যারিকুলাম বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইতোমধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন প্রফেসর হক। ২০০৬-২০০৭ সালে ধর্মতত্ত্ব অনুষদের অর্ডিন্যান্স এ রেডিক্যাল চেঞ্জ আসে-চালু করা হয় সেমিস্টার পদ্ধতি এবং ২২০০ মার্কের অনার্স কোর্স ৪২০০ মার্কে উন্নীত হয়। এতে স্বাভাবিকভাবে ২০টি কোর্স নতুনভাবে সংযোজন করার সুযোগ ঘটে এবং সিলেবাস ও ক্যারিকুলাম রি-ডিজাইনিং এর দায়িত্ব পড়ে সভাপতি হিসেবে প্রফেসর ড. মো. ময়নুল হকের ওপর। বিভাগীয় শিক্ষকবৃন্দের সহযোগিতায় তিনি কুরআন ও হাদীস ভিত্তিক মৌলিক জ্ঞানসমূহের পাশাপাশি অতি আধুনিক বিষয়াবলীকে সংযুক্ত করে আল-হাদীস বিভাগের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিলেবাস -ক্যারিকুলাম উপহার দেন।

২০১৯-২০২০ সালে নতুন অর্ডিন্যান্স তৈরি হলে বিভাগীয় ক্যারিকুলাম কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান প্রফেসর হক এবং তা সফলভাবে সম্পন্ন করেন। ইউজিসির নতুন নির্দেশনার আলোকে অর্ডিন্যান্স আবারো পরিবর্তন হলে পুনরায় তিনি কনভেনার হিসেবে দায়িত্ব পান এবং Outcome Based Education (OBE) এর আলোকে অনার্স ও মাস্টার্স ক্যারিকুলাম তৈরিতে অসামান্য অবদান রাখেন, যা এখন শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে শোভা পাচ্ছে।

জানা যায়, প্রফেসর হক বর্তমানে বাংলাদেশের একটি পাবলিক ইউনিভার্সিটির একাডেমিক মাস্টার প্লান তৈরির কাজে দেশীয় ক্যারিকুলাম এক্সপার্ট হিসেবে নরওয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের (বিদেশী ক্যারিকুলাম এক্সপার্ট) সাথে যৌথভাবে কাজ করছেন।

প্রফেসর হক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, যাদের বাড়ি ঘর ৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী আর্মীরা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞান মনষ্কতা ও আধুনিক মননশীলতার ছাপ এ শিক্ষাবিদের প্রতিটি কাজেই বর্তমান। তাঁর অধীনে এমফিল ও পিএইচডি. গবেষকবৃন্দের বিষয়বস্তু সিলেকশনেও দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজে লাগার মতো আধুনিক বিষয়াদীর আধিক্য দেখতে পাওয়া যায়। এ প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ দেশের এক অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে আরো সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। তাঁর জ্ঞান ও মেধায় উদ্ভাষিত হোক দেশ ও সমাজ। আমরা এ মহান শিক্ষাবিদের সুস্বাস্থ্য-সহ উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *