রমাদানের কিয়াম- সালাতুত তারাবীহ ও তার রাকাআত সংখ্যা তত্ত্ব

রমাদানের কিয়াম- সালাতুত তারাবীহ ও তার রাকাআত সংখ্যা তত্ত্ব

কুরআনের মাস, রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস, ভ্রাতৃত্বের মাস, সাম্যের ও ছবরের মাস মাহে রমাদান। প্রথমার্ধ আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তারাবীহ নিয়ে আমাদের ইলমের ফুলঝুরি ছুটাতে আমরা ব্যস্ত সময় পার করছি। কুরআনের মাসে খাতমে তারাবীহ এর সাধ-আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামতে অবগাহনের সুযোগ, আল্লাহ তা’আলা আমাদের যাদের ভাগ্যে জুটিয়েছেন তারা সবাই শুকরিয়া জানাই আল্লাহর- আল-হামদু লিল্লাহ। সেই সাথে সবাইকে রমাদানুল মোবারকের শুভেচ্ছা জানিয়ে তারাবিহ এর সালাতের রাকাআত সংখ্যা নিয়ে আমার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার প্রয়াশ পাব।

তারাবীহ সালাতের প্রচলন ও ফযিলত:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ 
আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেন: যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতাসিবের সাথে রমাদানের কিয়াম করবে আল্লাহ তা’আলা তার পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন। (মুত্তাফাকুন আলাইহি) সহীহুল বুখারী-৩৭, সহীহু লে মুসলিম-৭৫৯। রমাদানের কিয়ামের ফযিলত সম্পর্কে এ হাদীসটি প্রামাণ্য দলীল। আর রমাদানে কিয়ামুল্লাইল করা পাপরাশি মোচনের কারণ। আর যে ব্যক্তি তারাবীহ পড়বে সে কিয়ামুল্লাইল এর ফযিলত লাভে ধন্য হবে।

عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ المُؤْمِنِـينَ رَضِيَ اللهُ عَنهَا: “أَنَّ رَسُولَ الله صلى الله عليه وآله وسلم صَلَّى ذَاتَ لَـيْلَةٍ فِي المَسْجِدِ، فَصَلَّى بِصَلاَتِهِ نَاسٌ، ثُمَّ صَلَّى مِنَ القَابِلَةِ فَكَثُرَ النَّاسُ، ثُمَّ اجْتَـمَعُوا مِنَ اللَّيْلَةِ الثَّالِثَةِ أَوِ الرَّابِعَةِ، فَلَمْ يَخْرُجْ إِلَيْهِمْ رَسُولُ الله صلى الله عليه وآله وسلم، فَلَمَّا أَصْبَحَ قَالَ: «قَدْ رَأَيْتُ الَّذِي صَنَعْتُمْ، وَلَمْ يَمْنَعْنِي مِنَ الخُرُوجِ إِلَيْكُمْ إِلَّا أَنِّي خَشِيتُ أَنْ تُفْرَضَ عَلَيْكُمْ»؛ وَذَلِكَ فِي رَمَضَانَ. متفق عليه.
উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. রাতে মাসজিদে সালাত আদায় করছিলেন, সাহাবা রা. তাঁর সাথে সালাত আদায় করেন। পরবর্তী রাতে তিনি সালাত পড়লেন অনেক সাহাবীকে সাথে নিয়ে। অত:পর তৃতীয় কী চতুর্থ রাতে রাসূল সা. ঘর থেকে আর বের হলেন না। যখন ফজর এর ওয়াক্ত হলো তখন তিনি বের হয়ে বললেন: তোমরা যা করেছো আমি তা দেখেছি। আমি এ সালাত তোমাদের উপর ফরয হয়ে যেতে পারে ভয়ে তোমাদের নিকট আসি নাই। আর এটা ছিল রমাদানে। (সহীহুল বুখারী-১১২৯)।

عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ المُؤْمِنِـينَ رَضِيَ اللهُ عَنهَا قالتْ: “كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وآله وسلم إِذَا دَخَلَ العَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأحْيَا لَيْلَهُ، وَأيْقَظَ أهْلَهُ” متفق عليه.
উম্মুল মুমিনীন আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: যখন রমাদানুল মোবারকের শেষ দশকে রাসূল সা. প্রবেশ করতেন তখন তহবন্দ শক্ত করে বাধতেন, রাত্রি জাগরণ করতেন এবং পরিবারের সবাইকে জাগিয়ে তুলতেন। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)
عن أبي ذر الغفاري  قال قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم: إنَّ الرَّجلَ إذا صلَّى معَ الإمامِ حتَّى ينصرفَ حسبَ لَه قيامُ ليلةٍ
আবূ যর গেফারী রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি ইমামের সাথে সালাত আদায় করে বাড়ী ফিরলো, সে যেনো সারা রাত কিয়াম করলো। (সুনান আবি দাউদ-১৩৭৫, সুনানুত তিরমিযী-৮০৬, সুনানুন নাসাঈ-১৩৬৪, সুনানু ইবনু মাজাহ-১৩২৭)।
উপরোক্ত হাদীসসমূহ রমাদানুল মোবারকে কিয়ামুল লাইলকে সাব্যস্ত করে যার মূল উপাদান আমাদের কাছে তারাবীহ সালাত হিসেবে পরিচিত।

তারাবীহ শব্দটি বহুবচন, তারবীহাতুন এক বচন যার আভিধানিক অর্থ একবার বিরতি ও বিশ্রাম গ্রহণ করা। এর দ্বি-বচন হলো তারবীহাতান। দুই দুই রাকাআত করে চার রাকাআত আদায়ের পর কিছু সময় বিরতি বা ইন্টারভেল দিয়ে আরাম আয়েশে যে সালাত আদায় করা হয় সেটাই তারাবীহ সালাত হিসেবে পরিচিত। বহুবচনীয় এ শব্দ দ্বারা কমপক্ষে তিন তারবীহাত বা তিনবার বিরতি দিয়ে যে সালাত আদায় করা হয় অর্থাৎ কমপক্ষে বারো রাকাআত পড়াকে তারাবীহ বলে।

তারাবীহ এর সময়কাল রমাদানুল মুবারক মাসের প্রতিটি রাতে এশার সালাত আদায়ের পর থেকে শুরু করে ফজরের আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, কারো কারো নিকটে নফল বা নবীর সুন্নাত। রাসূল সা. জীবনের শেষ রমাদানে এটি পড়েছেন জামাতের সাথে তিন রাত কিন্তু সাহাবাদের আগ্রহ ও এতে অংশ গ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় রাসূল সা, শংকিত হয়ে পড়েন যদি আল্লাহ তাআলা ফরয করে দেন তাহলে তার উম্মতের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। সেজন্য রাসূল সা. চতুর্থ রাতে একেবারে ফজরের সময় হাজির হয়ে ফজরের সালাত আদায় করে সাহাবাদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন কেন তিনি তারাবীহতে আসেননি। (সহীহুল বুখারী-১০১২)। রাসূল সা. এর ওফাত পর্যন্ত তিনি বাড়ীতে একাকী পড়লেও জামাতবদ্ধ হয়ে এটি আর আদায় করেননি। আবূ বকর রা. এর খেলাফত কাল পর্যন্ত সাহাবা রা. একাকি মসজিদে বা বাড়ীতে যে যার মত করে তারাবীহ এর সালাত আদায় করেছেন। ওমার রা. এর খেলাফতের দ্বিতীয় বর্ষে অর্থাৎ হিজরী চতুর্দশ সনে সাহাবাদের ইজমার ভিত্তিতে জামাতবদ্ধভাবে তারাবীহ আদায় শুরু হয়।

عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ عَبْدِالرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدٍ القَارِيِّ، أَنَّهُ قَالَ: خَرَجْتُ مَعَ عُمَرَ بْنِ الخَطَّابِ (، لَيْلَةً فِي رَمَضَانَ إِلَى المَسْجِدِ، فَإِذَا النَّاسُ أَوْزَاعٌ مُتَفَرِّقُونَ، يُصَلِّي الرَّجُلُ لِنَفْسِهِ، وَيُصَلِّي الرَّجُلُ فَيُصَلِّي بِصَلاَتِهِ الرَّهْطُ، فَقَالَ عُمَرُ: إِنِّي أَرَى لَوْ جَمَعْتُ هَؤُلاَءِ عَلَى قَارِئٍ وَاحِدٍ، لَكَانَ أَمْثَلَ ثُمَّ عَزَمَ، فَجَمَعَهُمْ عَلَى أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، ثُمَّ خَرَجْتُ مَعَهُ لَيْلَةً أُخْرَى، وَالنَّاسُ يُصَلُّونَ بِصَلاَةِ قَارِئِهِمْ، قَالَ عُمَرُ: نِعْمَ البِدْعَةُ هَذِهِ، وَالَّتِي يَنَامُونَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنَ الَّتِي يَقُومُونَ يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ أَوَّلَهُ.

আবদুর রহমান ইবনু আবদিল কারিয়্যু রহ. বলেছেন: আমি মাহে রমদানে ওমার ইবনুল খাত্তাব রা.-এর সাথে মসজিদের দিকে গমন করি, (সেখানে গিয়ে) দেখি লোকজন বিভিন্ন দলে বিভক্ত। কেউ একা সালাত পড়ছে, আবার কেউ-বা সালাত পড়ছেন এবং তার ইমামতিতে একদল লোকও সালাত আদায় করছেন। ওমার রা. বললেনঃ আমি মনে করি যে, যদি এই মুসল্লিগণকে একজন কারীর সাথে একত্র করে দেওয়া হতো। অতঃপর তিনি উবাই ইবনু কা’ব রা.-এর ইমামতিতে একত্র করে দিলেন। (আবদুর রহমান) বলেন: দ্বিতীয় রাত্রেও আমি তার সাথে (মসজিদে) গমন করলাম। তখন লোকজন তাদের কারীর ইমামতিতে সালাত পড়ছিলেন। ওমার রা. বললেনঃ (نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ) এটা অতি চমৎকার বিদ’আত বা নূতন পদ্ধতি। আর যে সালাত হতে তারা ঘুমিয়ে থাকে তা উত্তম ঐ সালাত হতে, যে সালাতের জন্য তারা জাগ্রত হয়, অর্থাৎ শেষ রাতের সালাতই উত্তম। [সহীহুল বুখারী: ২০১০]

ওমার রা. এর নির্দেশনায় উবাই ইবনু কাব রা. এর ইমামতিতে মদীনার মাসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হয় মুহাজির ও আনসার সাহাবা ও তাবেঈগণকে নিয়ে। মূলত ওমার রা. রাসূল সা. এর সুন্নাতকেই পুনরুজ্জীবন দেন সাহাবা রা. এর ঐক্যমতের ভিত্তিতে। কারণ তখন রাসূল সা. এর ওফাতের ফলে এটি ফরয হওয়ার শংকা দূরীভূত হয়ে গিয়েছিল। আর এভাবেই তারাবীহ বিশ রাকাত ও বেতের তিন রাকাআতসহ মোট তেইশ রাকাআতের প্রচলন হয়।

রাসূল সা. তারাবীহ সালাতের রাকাআত সংখ্যা নির্ধারণ করে দেননি, যে কারণে এর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্নতা রয়েছে_ বেতেরসহ ১১ ‘ ১৩’ ২১’ ২৩’ ৩৯’ ৪১ এবং ৪৯ রাকাআতের বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম আবূ হানিফা, শাফেঈ, আহমাদ ইবনু হাম্বল রহ. সহ জমহুর ওলামা এর মত হলো বেতেরসহ তেইশ রাকাআত এবং ইমাম মালেক রহ. এর প্রসিদ্ধ মত হলো বেতেরসহ উনচল্লিশ রাকাআত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। ইমাম মালেক রহ. বলেন: আমি মদীনাবাসীকে ৩৬ রাকাআত তারাবীহ পড়া অবস্থায় পেয়েছি। এর কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন: মক্কার হারামে তারাবীহ পড়া হতো বিশ রাকাআত এবং প্রতি চার রাকাআত অন্তর বিশ্রাম দেয়া হতো বিরতির এ সময়ে মুসল্লীগণ বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতেন এবং দু’ রাকাআত তাওয়াফের সুন্নাহ আদায় করতেন। এ কথা মদীনাবাসী জানার পর তাদের যেহেতু এ সুযোগ নেই তারা তারাবীহ এর মাঝের চার বিরতিতে চার x চার=১৬ রাকাআত তারাবীহ বাড়িয়ে পড়া শুরু করেন। ইমাম শাফেঈ রহ.কে তারাবীহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: আমি মক্কাবাসীকে বিশ রাকাআত পড়তে দেখিছি এবং মদীনাবাসী ৩৬ রাকাআত পড়েন শুনেছি। তুমি যে কোনটা আদায় করতে পারো।

তারাবীহ সালাতের রাকাআত সংখ্যা হাদীস থেকে যা পাই:
হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হাদীস ১১রাকাআত তথা তারাবীহ ৮ রাকাআত ও বিতের তিন রাকাআতকে সাপোর্ট করে।
عن عائشة رض قالت ما كان رسول الله صلي الله عليه و سلم يزيد في رمضان و لا في غيره علي إحدي عشرة ركعة يصلي ٱربعا فلا تسئل عن حسنهن و طولهن ثم يصلي ٱربعا فلا تسئل عن حسنهن و طولهن ثم يصلي ثلاثا
হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রমাদান ও রমাদানের বাইরে রাসূল সা. এগারো রাকাআতের বেশী পড়েন নাই। চার রাকাআত পড়তেন-তাঁর এ সালাত এত সন্দুর, এতো দীর্ঘ ছিল যে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না ,আবার চার রাকাআত পড়তেন- তাঁর এ সালাত এত সন্দুর, এতো দীর্ঘ ছিল যে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অত:পর তিনি তিন রাকাআত পড়তেন। (মুত্তাফাকুন আলাইহি, বুখারী-১১৪৭, মুসলিম-৭৩৮, তিরমিযী-৪৩৯)। হাদীসটি সহীহ।

যারা এ হাদীসকে তারাবীহ আট রাকাআতের দলীল হিসেবে উপস্থাপন করেন তারা আবার বিতের এক রাকাআতকে সহীহ মনে করেন। বিষয়টি স্মিয়ের উদ্রেক করে বটে! এটি আসলে তাহাজ্জুদ বেতেরসহ ১১ রাকাআতকেই বুঝায় যা রাসূল সা. সারা বছর আদায় করতেন এবং তা তাঁর উপর ফরয ছিল। হাদীসের বক্তব্য ‘রমাদান ও রমাদানের বাইরে’কথাটিই স্পষ্টতই তাহাজ্জুদ সালাতকে ইংগিত করে এবং বিতের যে তিন রাকাআত সেটাকেও প্রমাণ করে।
سَأَلْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، عن صَلَاةِ رَسولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ باللَّيْلِ؟ فَقالَتْ: سَبْعٌ، وتِسْعٌ، وإحْدَى عَشْرَةَ، سِوَى رَكْعَتي الفَجْرِ.»
তাবেঈ মাসরুক ইবনু আজদা‘ বলেন, আমি হযরত আয়িশা রা.কে জিজ্ঞেস করলাম- রাসূল সা. এর রাতের সালাত সম্পর্কে। তিনি বললেন: ফজরের দু’রাকাআত সুন্নাত ব্যতিত সাত, নয় এবং এগারো রাকাআত সালাত পড়তেন। সহীহুল বুখারী, হাদীস নং-১১৩৯। হাদীসটি সহীহ।

কখনও কখনও রাসূল সা. তাহাজ্জুদ (নফল) চার রাকাআত বিতেরসহ সাত রাকাআত, কখনও তাহাজ্জুদ ছয় রাকাআত বিতেরসহ নয় রাকাআত এবং কখনও আট রাকাআত বিতেরসহ এগারো রাকাআত পড়তেন।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يصلى بالليل ثلاث عشرة ركعة.
আল্লাহর রাসূল সা. রাতে তের রাকাআত সালাত পড়তেন। (দশ রাকাত নফল তিন রাকাত বিতের)। সহীহ বুখারী, হাদীস: ১১৬৪। হাদীসটি সহীহ।

উপর‌রোক্ত দু’টি সহীহ হাদীসই প্রমাণ করে রাসূল সা. এর রাতের সালাত তাহাজ্জুদ যা কুরআনের ভাষায় নফল বলা হলেও রাসূল সা. এর উপর ফরয ছিল তার রাকাআত সংখ্যা নির্ধারিত নয়। অধিকাংশ সময়ে তিনি আট রাকাআত পড়েছেন এবং উদ্ভূত বিবিধ কারণে তিনি এর কম-বেশীও পড়েছেন।
وفي الصَّحيحَينِ مِن حَديثِ ابنِ عُمَرَ رَضيَ اللهُ عنهما:كان رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ يُصلِّي مِن اللَّيلِ مَثْنى مَثْنى، ويُوتِرُ برَكعة. وروى النَّسائيُّ عن أُبَيِّ بنِ كَعبٍ رَضيَ اللهُ عنه: «أنَّ رسولَ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ كان يُوتِرُ بثَلاثِ رَكعاتٍ
রাসূল সা. এর প্রিয় সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সা. রাতে (বাদ এশা) দু’রাকাআত দু’রাকাআত করে সালাত পড়তেন এবং বিতের এক রাকাআত পড়তেন। সহীহুল বুখারী। একই হাদীস ইমাম নাসাঈ রহ. উবাই ইবনু কা’ব রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যেখানে উল্লেখ রয়েছে রাসূল সা. বিতের তিন রাকাআত পড়তেন।
بَيانُ هَدْيِه صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ في عدَدِ رَكعاتِ قِيامِ اللَّيلِ- صَلاةُ اللَّيْلِ مَثْنَى مَثْنَى، فإذا رَأَيْتَ أنَّ الصُّبْحَ يُدْرِكُكَ فأوْتِرْ بواحِدَةٍ. فقِيلَ لاِبْنِ عُمَرَ: ما مَثْنَى مَثْنَى؟ قالَ: أنْ تُسَلِّمَ في كُلِّ رَكْعَتَيْنِ.
কিয়ামুল্লাইল সম্পর্কে রাসূল সা. এর নির্দেশনা হলো: রাতের সালাত দু’রাকাআত দু’রাকাআত। যখন তুমি দেখতে পাবে ফজরের সময় হয়ে এসেছে তখন বিতের এক রাকাআত পড়বে। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার রা.কে জিজ্ঞেস করা হলো: দু’রাকাআত দু’রাকাআত এর অর্থ কী? তিনি বললেন: প্রত্যেক দু’রাকাআতের পর সালাম ফিরাবে। সহীহুল বুখারী-৯৯০, সহীহু লে মুসলিম-৭৪৯। হাদীসটি সহীহ।
سَأَلَ رَجُلٌ النبيَّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ وهو علَى المِنْبَرِ: ما تَرَى في صَلَاةِ اللَّيْلِ؟ قَالَ: مَثْنَى مَثْنَى، فَإِذَا خَشِيَ الصُّبْحَ صَلَّى واحِدَةً، فأوْتَرَتْ له ما صَلَّى. وإنَّه كانَ يقولُ: اجْعَلُوا آخِرَ صَلَاتِكُمْ وِتْرًا؛ فإنَّ النبيَّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ أمَرَ بهِ.
জুমার দিন মিম্বরে থাকা অবস্থায় এক ব্যক্তি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, রাত্রিকালীন সালাত সম্পর্কে আপনার মতামত কী? তিনি বললেনঃ দুই দুই করে, অতঃপর যদি সে ভোরের ভয় করে তবে সে এক রাকাআত সালাত আদায় করবে এবং যতক্ষণ সে সালাত আদায় করবে ততক্ষণ এ এক রাকাআত তার জন্য বিতের বলে গণ্য হবে। বর্ণনাকারী (আব্দুল্লাহ ইবনু ওমার রা.) বলেন: তোমরা তোমাদের রাতের সালাতের শেষ সালাতকে বিতের বানাও কেননা নবী সা. এটির নির্দেশ দিয়েছেন। সহীহুল বুখারী-৪৭২। হাদীসটি সহীহ।
উপরোক্ত হাদীসসমূহ প্রামাণ্য দলীল ফজরের সময় অত্যাসন্ন হলে বিতের এক রাকাআত পড়াকেও রাসূল সা. বৈধতা দিয়েছেন।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রা: হতে বর্ণিত হয়েছে:
صلى بنا رسول الله صلى الله عليه وسلم في شهر رمضان ثماني ركعات وأوتر
অর্থাৎ নবী সা. রমাদান মাসে আমাদেরকে নিয়ে আট রাকআত সালাত আদায় করেন অত:পর বিতর আদায় করেন। (তাবারানী ও সহীহ ইবনে খুযাইমা।) হাদীসটি হাসান পর্যায়ের। এ হাদীসকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী হানাফী রহ. বলেন: নবী সা. রমাদান মাসে মোট ৩ দিন আট রাকআত তারাবীহ পড়িয়েছিলেন।

কিন্তু প্রশ্ন দাড়ায় রাসূল সা. বিতের সালাত পড়িয়েছেন অর্থ তাহাজ্জুদ সালাতসহ পড়িয়েছেন। কাজেই এটি তারাবীহ সালাত ছিল, না তাহাজ্জুদ সালাত ছিল? কারণ তারাবীহ সালাত রাসূল সা. যে কয়দিন পড়িয়েছেন তা ছিল বাদ এশা এবং মধ্য রাতের আগেই। রাসূল সা. এর উপর ফরয ছিল তাহাজ্জুদ সালাত যা আদায়ের পরই তিনি বিতের পড়তেন।
মুয়াত্তা ইমাম মালিকে বর্ণিত হাদীস:
عن محمد بن يوسف عن السائب بن يزيد انه قال أمر عمر بن الخطاب رضي الله عنه ابي بن كعب وتميما الداري أن يقوما للناس بإحدى عشرة ركعة.
মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ হতে ইমাম মালেক রহ. বর্ণনা করেন, তিনি সায়েব ইবনু ইয়াযীদ রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, ওমার রা: উবাই ইবনু কা’ব রা: ও তামীম দারী রা. কে নির্দেশ প্রদান করেন তারা উভয়েই যেন রমাদান মাসে ১১ রাকআত সালাতের ইমামতি করেন। সহীহুল বুখারী ও মুসলিম এর শর্ত অনুযায়ী হাদীসটি সহীহ।

সহীহুল বুখারীতে আবদুর রহমান ইবনু আবদিল কারিয়্যু রহ. বর্ণিত হাদীসটি ইমাম মালেক রহ. বর্ণিত হাদীসে ওমার রা. এর উবাই ইবনু কা’ব রা: ও তামীম দারী রা. কে এগারো রাকাআতের নির্দেশনা মূলত তাহাজ্জুদের জামাআত কায়েম করার প্রসঙ্গে। যেখানে ওমার রা. এর এ বক্তব্যটি একেবারেই স্পষ্ট:
….قَالَ عُمَرُ : الَّتِي يَنَامُونَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنَ الَّتِي يَقُومُونَ‏.‏ يُرِيدُ آخِرَ اللَّيْلِ، وَكَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ أَوَّلَهُ‏
‘আবদুর রাহমান ইবনু ‘আবদ আল-ক্বারী রহ. থেকে বর্ণিত:
ওমার রা. বলেন:-তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাকো, (অর্থাৎ তাহাজ্জুদের সময়) তা রাতের ঐ অংশ (অর্থাৎ ইশার পর পর রাতের প্রথম ভাগ) অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা (তারাবীহর) সালাত আদায় কর, এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন, কেননা তখন রাতের প্রথমভাগে লোকেরা তারাবীহর সালাত আদায় করত। (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ২০১০)।

আমরা জানি, তারাবীহর ওয়াক্ত এশার পর থেকে শুরু হয় ৷ কিন্তু তাহাজ্জুদ এশার পর থেকে অর্থাৎ প্রথম রাত্রিতে পড়া যায় না ৷ কারণ তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত শুরু হয় মধ্যরাত্রি থেকে, আর এটা শেষ রাত্রি পর্যন্ত স্হায়ী থাকে৷ আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে এ দিকেই ইংগিত করে বলেছেন:
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ ﴿1﴾ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا ﴿2﴾ نِصْفَهُ أَوِ انْقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا ﴿3﴾ أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا ﴿4﴾
হে চাদরাবৃত ব্যক্তি! রাতের সামান্য একটা অংশ জাগ্রত থাকুন-অর্ধেকাংশ বা তার চেয়ে কম অথবা বেশী এবং কুরআনকে শুদ্ধাভাবে পাঠ করুন।(সূরা মুযযাম্মিল-১-৪)। كانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ ما يَهْجَعُونَ (17) وَبِالْأَسْحارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ (18 তারা রাতের একটি ক্ষুদ্র অংশ জেগে থাকবে (17) এবং ভোরবেলা তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে (18)। (সূরা আয যারিয়াত-১৭-১৮)।

অপরদিকে, রাসুলুল্লাহ সা. তারাবীহ পড়েছেনই প্রথম দিন ‘‘অর্ধ রাত্রির পূর্বেই’’ «রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত» ৷ আর আরেক দিন তারাবীহ পড়েছেন “অর্ধ রাত্রি” পর্যন্ত ৷ ( সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদীস নং- ১৩২৭)
অর্থাৎ মধ্যরাত থেকে তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই রাসুল সা. এর দুই দিনের তারাবীহ শেষ হয়ে গিয়েছিলো ৷

সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত হযরত ওমর রা. এর উক্ত নির্দেশনার বিষয়টা মুয়াত্তা ইমাম মালেকে বর্ণিত হয়েছে এভাবে:
و حَدَّثَنِي عَنْ مَالِك عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يُوسُفَ عَنْ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ أَنَّهُ قَالَ، أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً قَالَ وَقَدْ كَانَ الْقَارِئُ يَقْرَأُ بِالْمِئِينَ حَتَّى كُنَّا نَعْتَمِدُ عَلَى الْعِصِيِّ مِنْ طُولِ الْقِيَامِ وَمَا كُنَّا نَنْصَرِفُ إِلَّا فِي فُرُوعِ الْفَجْرِ.
ইমাম মালেক রহ. মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ রহ. থেকে, তিনি সায়িব ইবনু ইয়াযীদ রা. থেকে বর্ণনা করেন:
ওমার ইবনুল খাত্তাব রা. উবাই ইবনু কা’ব এবং তামীম দারী রা.-কে লোকজনের (মুসল্লিগণের) জন্য এগার রাক’আত কায়েম করতে (পড়াইতে) নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারী ২০০ আয়াত বিশিষ্ট সূরা পাঠ করতেন, আর আমরা সালাতে দীর্ঘ সময় দাঁড়ানোর কারণে লাঠির উপর ভর দিতাম। আমরা ভোর (ফজর) না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে আসতাম না । (মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং ২৪৩)।
এগারো রাকআত বা তেরো রাকাআতের হাদীসসমূহ বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্টভাবেই বুঝা যায় তা তাহাজ্জুদ সালাত সংক্রান্ত, তারাবীহ নয়।

তারাবীহ বিশ রাকাআত:
عن السائب بن يزيد أنه قال : ( أَنَّ عُمَرَ بنَ الخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنهُ جَمَعَ النَّاسَ فِي رَمَضَانَ عَلَى أُبَيِّ بنِ كَعبٍ وَعَلَى تَمِيمٍ الدَّارِيِّ عَلَى إِحدَى وَعِشرِينَ رَكعَةً ، يَقرَؤُونَ بِالمِئِينَ ، وَيَنصَرِفُونَ عِندَ فُرُوعِ الفَجرِ )
সায়েব ইবনু ইয়াযীদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: ওমার ইবনুল খাত্তাব রা. রমাদানুল মোবারকে উবাই ইবনু কা’ব রা. এবং তামীমদ দারী রা. এর ইমামতীতে লোকজনকে একুশ রাকাআত এর উপর একত্রিত করেছিলেন এবং তাঁরা উভয়েই দুই শতাধিক আয়াত পাঠ করতেন এবং লোকজন ফজর হওয়ার পূর্বেই বাড়ী ফিরে যেতো।

এ হাদীসটি সায়েব ইবনু ইয়াযীদ রা. থেকে একদল তাবেঈন বর্ণনা করেছেন যাদের বর্ণনায়-বিশ, একুশ ও তেইশ রাকাআতের কথা উল্লেখ করেছেন। (মূলত বিতের ছাড়া বিশ, বিতের এক রাকাআতসহ একুশ এবং বিতের তিন রাকাআতসহ তেইশ রাকাআতের কথা উল্লেখিত হয়েছে।) মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ রহ. এর বর্ণনা এসেছে মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক-৪/২৬০, ইয়াযীদ ইবনু খুসাইফা রহ. এর বর্ণনা এসেছে ইমাম বায়হাকীর সুনানুল কুবরাতে-২/৪৯৬, মুসনাদে ইবনুল জা’দ-১/৪১৩ এবং হারেস ইবনু আব্দির রহমান রহ. এর বর্ণনা এসেছে মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৪/২৬১)। আর এসব রাবী বা বর্ণনাকারীগণ সবাই নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত এবং সায়েব ইবনু ইয়াযীদ রা. থেকে সহীহ সনদে তারা এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
عَنْ مَالِك عَنْ يَزِيدَ بْنِ رُومَانَ أَنَّهُ قَالَ كَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ فِي زَمَانِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فِي رَمَضَانَ بِثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ رَكْعَةً
ইমাম মালিক রহ. ইয়াযীদ ইবনু রুমান রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন: লোকজন ওমার ইবনুল খাত্তাব রা.-এর খিলাফতকালে রমাদানে তেইশ রাক’আত তারাবীহ পড়তেন, তিন রাকাআত বিতর এবং বিশ রাকাআত তারাবীহ। এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইয়াযীদ ইবনু রুমান সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে তিনি ওমার রা. এর দেখা পাননি কারণ তার জন্ম অনেক পড়ে। এর উত্তরে যা বলা হয়ে থাকে তা হলো মদীনার সমাজ ব্যবস্থাটাই ছিল একটা সনদ যে কারণে ইবনু রুমান মদীনার সমাজে প্রচলিত তারাবীহ তেইশ রাকাআতের বর্ণনা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ ভালো জানেন।

সায়েব ইবনু ইয়াযীদ রা. বলেন:
كانوا يقومون على عهد عمر بن الخطاب رضي الله عنه في شهر رمضان بعشرين ركعة قال وكانوا يقرؤون بالمئين وكانوا يتوكؤون على عصيهم في عهد عثمان بن عفان رضي الله عنه من شدة القيام.
তারা (সাহাবা ও তাবেয়ীন) ওমার ইবনুল খাত্তাব রা. এর যুগে রমাদান মাসে বিশ রাকাত (তারাবীহ) পড়তেন। তিনি আরও বলেছেন যে, তারা সালাতে শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সূরাসমূহ পড়তেন এবং উসমান ইবনু আফফান রা. এর যুগে দীর্ঘ সালাতের কারণে তাদের (কেউ কেউ) লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। (আস সুনানুল কুবরা বাইহাকী ২/৪৯৬, হাদীস: ৪৮০১), এ হাদীসটি সহীহ। ইমাম নববী, আল্লামা আইনী ও ইমাম যায়লাঈ রহ. প্রমুখ এ হাদীসের সনদকে সহীহ বলেছেন।
عن أبي الحسناء أن عليا رضي الله عنه أمر رجلا أن يصلى بهم في رمضان عشرين ركعة.
আবুল হাসনা রহ. থেকে বর্ণিত যে, আলী রা. এক ব্যক্তিকে আদেশ করেন, তিনি যেন লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়েন। (মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবা, হাদীস: ৭৭৬৩, আস সুনানুল কুবরা, বাইহাকী ২/৪৯৭, হাদীস: ৪৮০৫)। হাদীসটির সনদ হাসান।

তাবেঈ আতা ইবনু আবী রাবাহ রহ. বলেন: أدركت الناس وهم يصلون ثلاثا وعشرين ركعة بالوتر.
আমি লোকদেরকে (সাহাবা ও প্রথম সারির তাবেঈনকে) দেখেছি, তারা বিতরসহ তেইশ রাকাআত সালাত পড়তেন। -(মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবা, ২/৩৯৩, হাদীস: ৭৭৭০, আছারুস সুনান, পৃষ্ঠা:২০৯)। আল্লামা নিমাবী রহ. এ হাদীসের সনদকে হাসান বলেছেন।

তাবেঈ নাফে রহ. বলেন: كان ابن أبي مليكة يصلي بنا في رمضان عشرين ركعة.
রমাদান মাসে ইবনু আবী মুলাইকা আমাদেরকে বিশ রাকাত সালাত পড়াতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস: ৭৬৮৩, আছারুস সুনান, পৃষ্ঠা: ২১০)। আল্লামা নিমাবী রহ. এ হাদীসের সনদকে সহীহ বলেছেন।

উপরোক্ত বর্ণনাগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল যে, তারাবীহর সালাত বিশ রাকাত। এবং সকল সাহাবী এর উপর একমত পোষণ করেছেন। কেউ দ্বিমত করেননি। “মূলত বিশ রাকাআত সাব্যস্ত হয়েছে সাহাবা রা. এর ইজমা দ্বারা ওমার রা. এর সময়ে।” (ফাতওয়া আল আজহার, ১ম খন্ড,পৃ ৪৮।)
ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. বলেন:
إنه قد ثبت أن أبي بن كعب كان يقوم بالناس عشرين ركعة في قيام رمضان و يوتر بثلاث فرأى كثير من العلماء أن ذلك هو السنة لأنه أقامه بين المهاجرين و الأنصار و لم ينكره منكر .
এটা প্রমাণিত যে, উবাই ইবনে কাব রা. রমাদানের তারাবীহ লোকদেরকে নিয়ে বিশ রাকাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতের পড়তেন। তাই বহু আলেমের সিদ্ধান্ত, এটাই সুন্নাহ। কেননা উবাই ইবনু কাব রা. মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের উপস্থিতিতে বিশ রাকাত পড়িয়েছেন। এবং কেউ তাতে আপত্তি করেননি। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া ২৩/১১২-১২৩)।
তিনি আরও বলেন-ثبت من سنة الخلفاء الراشدين وعمل المسلمين. খোলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহ ও মুসলমানদের আমল দ্বারা তা (বিশ রাকাত তারাবী) প্রমাণিত।

বিন বায রহ. বলেন:
২৩ রাকাআত (বিতির সহ) হযরত ওমার রা. ও সাহাবায়ে কেরাম পড়েছেন। এতে কোন অসুবিধা নেই, বরং তা খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নত এর অন্তর্ভুক্ত। (মাজমূ ফাতাওয়া বিন বায ১১/৩২৫)।

রাসূল সা. সাহাবা রা. এর সুন্নাহকে প্রতিপালনের নির্দেশনা দিয়েছেন:
قال صلى الله عليه وسلم:  إِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلافًا كَثِيرًا ، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلالَةٌ.
রাসূল সা. বলেছেন: আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে তারা অচিরেই অনেক মতপার্থক্য দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহ ও আমার পরবর্তী সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ খলিফাদের সুন্নাহ প্রতিপালন করবে এবং মাড়ির দাত দিয়ে দৃঢ়ভাবে সে সুন্নাহকে আকড়ে ধরবে। (দ্বীনের মধ্যে )নব আবিস্কৃত বিষয়াদি থেকে সাবধান থাকবে। কেননা প্রত্যেক নব আস্কিৃত বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা। (সুনানু আবি দাউদ-৪৬০৭, সুনানুত তিরমিযী-২৬৭৬ এবং সুনানু ইবনু মাজাহ-৪৪)।

অপর একটি হাদীসও এখানে প্রণিধানযোগ্য:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو وَمُعَاوِيَةَ قَالَا قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ افْتَرَقَتِ اليَهُودُ عَلَى إحْدَى وَسَبْعِينَ فِرْقَةً وَافْتَرَقَتِ النَّصَارَى عَلَى ثنتين وسبعين فرقة، وستفترق هذه الأمة علىثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً قَالُوْا : مَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِيْ و فِيْ رِوَايَةٍالجَمَاعَةُ
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রা. ও মুআবিয়া রা. কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, ’’ইয়াহুদী একাত্তর দলে এবং খ্রিষ্টান বাহাত্তর দলে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। আর এই উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। যার মধ্যে একটি ছাড়া বাকী সব ক’টি জাহান্নামে যাবে।’’ অতঃপর ঐ একটি দল প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বললেন, ’’আমি ও আমার সাহাবা যে মতাদর্শের উপর আছি তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।’’ অন্য এক বর্ণনায় আছে, ’’তারা হল জামাআত।’’ (সুনান আরবাআহ, মিশকাত ১৭১-১৭২, সিলসিলাহ সহীহাহ ২০৩, ১৪৯২)

উক্ত হাদীসেরই শেষাংশ,
وَإِنَّهُ سَيَخْرُجُ مِنْ أُمَّتِى أَقْوَامٌ تَجَارَى بِهِمْ تِلْكَ الأَهْوَاءُ كَمَا يَتَجَارَى الْكَلْبُ لِصَاحِبِهِ لاَ يَبْقَى مِنْهُ عِرْقٌ وَلاَ مَفْصِلٌ إِلاَّ دَخَلَهُ
আমার উম্মতের কয়েকটি সম্প্রদায় বের হবে, যাদের মাঝে ঐ খেয়াল-খুশী প্রতিক্রিয়াশীল হবে, যেমন কুকুরে কামড় দেওয়া লোকের ভিতরে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিক্রিয়াশীল হয়। প্রত্যেক শিরা-উপশিরা ও জোড়ে-জোড়ে তা প্রবেশ করে। (আবূ দাঊদ ৪৫৯৯, হাকেম ৪৪৩, ত্বাবারানী, সঃ তারগীব ৪৯)।

সকলের ঐক্যমতে নাজাতপ্রাপ্ত দল হচ্ছে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত।

সাহাবা রা. এর যুগ থেকে সারা মুসলিম বিশ্বের সকল মসজিদে বিশ রাকাত তারাবীহ হয়ে আসছে। মক্কার মাসজিদুল হারাম মদীনার মাসজিদে নববীতে এবং আল আযহার মসজিদেও একই আমল হয়ে আসছে। সাহাবা, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন ও চার মাযহাব ও অন্যান্য ইমামগণ বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়েছেন এবং ইমাম বুখারী রহও বিশ রাকাত তারাবীহ পড়তেন।

১২৮৪ হিজরীর পরে এসে কিছু লোক বলা শুরু করেছে তারাবীহ আট রাকাআত, বিশ রাকাআত পড়া বিদআত। ওমার রা. বিদাআত করেছেন। ওমার রা. সাহাবা রা. এর বিচ্ছিন্নভাবে তারাবীহ সালাত আদায়কে সুশৃংখল অবস্থায় নিয়ে এসেছেন সাহাবা রা. এর ঐক্যমতের ভিত্তিতে। তিনি রাকাআত সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন যারা বলেন তারাও এ কথা ভালো করেই জানেন যে তারাবীহ সালাতের রাকাআত সংখ্যা রাসূল সা. নির্দিষ্ট করে যাননি। রাসূল সা. এর যুগ থেকে চলে আসা সাহাবা রা. এর আমলে ভিন্নতা ছিল। সালাতকে সহজবোধ্য করে তোলা, দীর্ঘ তেলাওয়াতের কারণে ক্লান্তি কিছুটা লাঘব করা এবং জামাতবদ্ধভাবে আদায়ের মাধ্যমে সালাতে শৃংখলা প্রতিষ্ঠাই ছিল ওমার রা. ও সাহাবা রা. এর ইজমার মূল লক্ষ্য। রাকাআত সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অর্থাৎ শরীআত প্রবর্তকের। বিশ রাকাআতের আমল সাহাবা রা. রাসূল সা. এর জীবদ্দশাতেই করেছেন যা রাসূল সা. কর্তৃক অনুমোদিত ছিল বিধায় সাহাবা রা. এ বিষয়ে ইজমা করেছেন। আর জামাতবদ্ধভাবে এ সালাত রাসূল সা. নিজেও আদায় করেছিলেন। রাসূল সা. ও সাহাবা রা. যে দীর্ঘ সময় নিয়ে এ সালাত আদায় করতেন আমরা সেটার প্রাক্টিস করে দেখতে পারি। সেটা না করে তারাবীহ নাম দিয়ে বিরতিহীনভাবে একদল কত দ্রুত শেষ করা যায় তার প্রতিযোগিতা করছি, আরেক দল নাজাতের সর্টকাট রাস্তা তালাশ করছি এবং নিজেরটাকে বৈধতা দেয়ার জন্য অহেতুক বিতর্ক তৈরী করছি এবং বিদআত বিদআত বলে চিল্লাচ্ছি।

সাহাবা রা. এর আমল তারাবীহ বিশ রাকাআত পড়া বিদআত নয়। বিদআত সে সব ইবাদাতকে বলা হয় যার কোন কুরআন ও হাদীস ব্যস্ড দলীল নেই। অর্থাৎ মন গড়া ইবাদাত তৈরী করা। রাসূল সা. তারাবীহ সালাতের রাকাআত সংখ্যা নির্ধারণ করে দেননি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য রাতের সালাত দুই দুই রাকাআত করে পড়বে। এছাড়াও বিশ রাকাআত তারাবীহ এটি তিনজন (ওমার, উসমান ও আলী রা.) খলিফার সুন্নাত। কাজেই আমাদেরকে সাহাবা রা. এর ইজমার উপর আমল করতে হবে। তারাবিহ দু রাকাআত দু রাকাআত করে দশ সালামে বিশ রাকাআত আদায় করতে হবে। এতে পুরো কুরআন খতম করা মুস্তাহাব।

আর ইজমা শরীআতের দলীল হিসেবে গণ্য। বিশ রাকাআত তারাবীহ তেরো শ বছর চলেছে এবং এখনো চলছে এই ইজমার উপরে। যাদের ইজমার উপরে আমরা কুরআন ও হাদীসকে অথিনটিক সোর্স হিসেবে পেয়েছি। আপনি যখন সাহাবা রা.কে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন স্বাভাবিকভাবে কুরআন ও হাদীস নিয়ে ইসলামের শত্রুদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরী করে দিবেন। আপনি ভেবে দেখুনতো-
ওমার রা. খলিফাতুল মুসলিমীন মদীনার মাসজিদে খুতবাহ দিতে দাড়িয়েছেন, একজন সাহাবা উঠে দাড়িয়ে বললেন আমরা আপনার কথা শুনবা না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা জানতে না পারি আপনার গায়ের জামা এত লম্বা হলো কীভাবে? আমরা তো এত লম্বা কাপড় পাইনি। ওমার রা. ছেলে আব্দুল্লাহকে ইশারাহ করলেন। আব্দুল্লাহ রা. উঠে দাড়িয়ে বললেন: আমার বাবা লম্বাকৃতির মানূষ তিনি ভাগে যে কাপড় পেয়েছেন তা দিয়ে উনার জামা হচ্ছিল না, আমি আমার অংশের কাপড় বাবাকে দিয়েছি যাতে তার জামাটা ভালো হয়। সেই ওমার রা. দ্বীনের বিষয়ে বিদাআত করলেন, সাহাবা রা. সবাই তা মেনে নিলেন এটা কী করে সম্ভব? যারা বিদাআত বলছেন আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত দান করুন।

তারাবীহ এবং তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করলে রমাদানের কিয়ামুল্লাইল পূর্ণমাত্রায় আদায় হবে। এর সাথে যদি আপনি পারেন তাহলে ইস্তেগফার, যিকির এবং কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের মাধ্যমেও কিয়ামুল্লাইল এরহক আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন। তারাবীহ এগারো রাকাআত, তেরো রাকাআত পড়ার বৈধতার সম্ভাবনা থাকলেও সাহাবা রা. কেনো সেটার উপর ইজমা করলেন না? সাহাবা রা. এর আমলকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখানোর হিম্মত যারা করে মাসজিদে বিশৃংখল অবস্থা তৈরী করছেন, রমাদানুল মোবারকের সম্মানে অন্তত সমাজটাকে ঐক্যতানে ইবাদাতে মশগুল হওয়ার সুযোগটুকু দিন। আর যদি আপনার বোধ ও বিশ্বাস এটাই হয় যে বিশ রাকাআত তারাবীহ পড়া বিদআত তাহলে সেরকম কোন মাসজিদ অথবা বাড়ীতে তা আদায় করুন। অথবা যে মাসজিদে বিশ রাকাআত তারাবীহ হয় সেখানে এশার সালাতের পর পেছনের সারিতে চলে যান এবং সেখানে তারাবীহ পড়ুন এতে বিশৃংখল অবস্থা কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।
ইমাম নাখয়ী রহ. এর বক্তব্য দিয়ে এ বিষয়ের ইতি টানতে চাই। তিনি বলেছেন – রমাদানের একটি সাওম অন্য সময়ের হাজার সাওম পালনের চেয়ে উত্তম, একবার তাসবিহ পাঠ করা অন্য সময়ে হাজার বার তাসবিহ পাঠের চেয়ে উত্তম, এক রাকাআত সালাত পড়া অন্য সময়ে হাজার রাকাআত সালাত পড়ার চেয়ে উত্তম।

আসুন আমরা সবাই রমাদানুল মোবারকে বেশী বেশী ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য হাসিল করি, নিজেদের অপরাধসমূহ মার্জনা করিয়ে নেই এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির ফয়সালা করিয়ে নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন। আমীন

লেখক: জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক, আল হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *